ইউরোপের বাজারে ভারতের শুল্কমুক্ত প্রবেশ, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) মধ্যে দীর্ঘদিনের আলোচনার পর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) চূড়ান্ত হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ। কারণ, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) শিল্পের প্রধান বাজারই ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার পর ভারতের তৈরি পোশাক ইউরোপে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে
ইউরোপের বাজারে ভারতের শুল্কমুক্ত প্রবেশ, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) মধ্যে দীর্ঘদিনের আলোচনার পর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) চূড়ান্ত হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ। কারণ, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) শিল্পের প্রধান বাজারই ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার পর ভারতের তৈরি পোশাক ইউরোপে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে। এতদিন স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) হওয়ার কারণে বাংলাদেশ 'Everything But Arms (EBA)' সুবিধার আওতায় ইউরোপে শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুযোগ পেয়েছে। অন্যদিকে ভারতকে একই ধরনের পণ্য রপ্তানিতে প্রায় ৯ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক দিতে হতো।
ভারত-ইইউ FTA কার্যকর হলে এই শুল্ক ধাপে ধাপে বা সম্পূর্ণভাবে তুলে দেওয়া হবে। ফলে ভারতের পণ্যের দাম ইউরোপীয় বাজারে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের মূল্যগত ব্যবধান প্রায় বিলীন হয়ে যাবে।
দ্বিগুণ চাপে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ ২০২৬ সালে LDC থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শুল্ক সুবিধা বজায় রাখলেও ২০২৯ সালের পর সেই সুবিধা হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ঠিক একই সময়ে ভারত যদি FTA-এর পূর্ণ সুবিধা ভোগ করতে শুরু করে, তাহলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশ যখন শুল্ক সুবিধা হারাবে, ভারত তখন একই বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে।
ভারতের বড় শক্তি কোথায়?
ভারতের অন্যতম বড় সুবিধা হলো শক্তিশালী টেক্সটাইল ও কাঁচামাল শিল্প। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তুলা উৎপাদক এবং নিজস্ব সুতা ও কাপড় উৎপাদনে অনেক এগিয়ে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সুতা, কাপড় ও অন্যান্য কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপের উৎপত্তি-সংক্রান্ত (Rules of Origin) শর্ত পূরণে ভারতের জন্য এটি বড় সুবিধা তৈরি করবে।
শুধু শুল্ক নয়, বিনিয়োগেও প্রভাব
FTA কার্যকর হলে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য ভারতে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন আরও লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ (FDI)-এর একটি অংশ বাংলাদেশ থেকে ভারতে সরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতের সঙ্গে EFTA (সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড ও লিশটেনস্টাইন) চুক্তির আওতায় আগামী ১৫ বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দেশটির উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়াতে সহায়তা করবে।
পরিবেশগত মানদণ্ডও হবে নতুন চ্যালেঞ্জ
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন কার্বন নিঃসরণ, টেকসই উৎপাদন এবং সাপ্লাই চেইনের স্বচ্ছতার ওপর কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ করছে। ভবিষ্যতে CBAM (Carbon Border Adjustment Mechanism)-এর মতো নীতির প্রভাবও আরও বাড়বে।
যেসব দেশ দ্রুত সবুজ উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পরিবেশবান্ধব কারখানায় বিনিয়োগ করবে, তারাই ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।
বাংলাদেশ কী করতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে এখনই কয়েকটি কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে হবে—
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে GSP+ সুবিধা নিশ্চিত করার কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা।
সুতা, কাপড় ও অন্যান্য কাঁচামালের দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করে শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তোলা।
উৎপাদন খরচ, বন্দর ব্যয় ও লজিস্টিকস উন্নত করে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো।
উচ্চমূল্যের পোশাক, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল এবং বৈচিত্র্যময় পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ানো।
পরিবেশবান্ধব ও কার্বন-কম উৎপাদনে দ্রুত রূপান্তর ঘটানো।
ভারত-ইউরোপ FTA বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য তাৎক্ষণিক সংকট তৈরি না করলেও এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। এতদিন যে শুল্ক সুবিধার কারণে বাংলাদেশ ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে ছিল, সেই সুবিধা দ্রুত কমে আসছে। ফলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা নির্ধারণ করবে উৎপাদন দক্ষতা, সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং বাণিজ্য কূটনীতি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এখনই প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রস্তুতি না নিলে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শক্ত অবস্থান ভারতের কাছে উল্লেখযোগ্যভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
লেখক ও বিশ্লেষক : এস গোস্বামী, সিএসবি নিউজ