শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন, বদলে যেতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির সমীকরণ
সকল দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের দিকে,কী হচ্ছে ডিসেম্বরে? শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বনাম ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ।
শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন, বদলে যেতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির সমীকরণ
বাংলাদেশ বর্তমান সময়ে বিশ্ব রাজনীতির আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। একদিকে এটি এশীয় ভূ-রাজনীতির দাবার বোর্ডে কৌশলগত প্রধান খুঁটি, অন্যদিকে বিশ্বশক্তিগুলোর মেরুকরণের এক মহাপরীক্ষাগার। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে অবস্থিত সেন্ট মার্টিনের কৌশলগত অবস্থান, কক্সবাজার ও উখিয়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, বাণিজ্যিক হাবে রূপান্তরিত চট্টগ্রাম এবং দেশের প্রবেশদ্বারখ্যাত পার্বত্য অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি—সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহ এখন তুঙ্গে।
*মূলত এই আগ্রহের জন্ম নিয়েছে ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে। সেই আগ্রহে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন স্বয়ং শেখ হাসিনা নিজেই। ৫ আগস্ট তথাকথিত "মেটিকুলাস ডিজাইনে" ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের পর শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এরপর থেকে তিনি ৫ আগস্টের বিক্ষোভকে দেশবিরোধী বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দিয়ে দেশে ফিরবেন বলে একাধিকবার জানান।*
তবে এবার ব্রিটিশ গণমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রথমবারের মতো সম্ভাব্য সময় উল্লেখ করে বলেন—তিনি বলেন ইনশাআল্লাহ ডিসেম্বরে দেশে ফিরবো এবং "যদি আমার মৃত্যু-ও হয়, আমি দেশের মাটিতেই মৃত্যুবরণ করতে প্রস্তুত।"
এই ঘোষণার পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে —ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন অধ্যায়ের সূচনার পাশাপাশি এটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন ভারসাম্য তৈরি করবে।
বাংলাদেশকে ঘিরে বর্তমানে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক হলেও অনেক ক্ষেত্রে পরস্পর-সংযুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং বঙ্গোপসাগরীয় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেখছে। অন্যদিকে চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, অবকাঠামো বিনিয়োগ, বন্দর উন্নয়ন এবং বাণিজ্যিক সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী।
ভারতের কাছে বাংলাদেশ কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; বরং উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সংযোগ, নদী ব্যবস্থাপনা এবং সীমান্ত সহযোগিতার অন্যতম প্রধান অংশীদার। একই সময়ে রাশিয়া পারমাণবিক জ্বালানি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং জ্বালানি খাতে অংশীদারিত্ব আরও গভীর করতে আগ্রহী।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি অংশীদার, বিনিয়োগ গন্তব্য এবং মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
মধ্যপ্রাচ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে ইরানের আগ্রহ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশকে শ্রমবাজার, বিনিয়োগ এবং মুসলিম বিশ্বের একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে।
পাকিস্তানও স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পর নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতায় ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ককে নতুনভাবে মূল্যায়নের চেষ্টা করছে। এই বহুমাত্রিক স্বার্থের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।
যদি শেখ হাসিনা সত্যিই ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন, তবে সেটি শুধুই বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির এক ঐতিহাসিক ঘটনা হবে। তবে এর রাজনৈতিক, সাংবিধানিক, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক প্রভাব নির্ভর করবে সে সময়কার বাস্তব পরিস্থিতি, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
এই মুহূর্তে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক উত্তাপ বৃদ্ধি, কূটনৈতিক তৎপরতা, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর এবং বিদেশি নীতিনির্ধারকদের সক্রিয় পর্যবেক্ষণ বাড়ছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ আজ আর কেবল ১৭ কোটির একটি রাষ্ট্র নয়; এটি ভারত মহাসাগরীয় ভূ-রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল, আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এখন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
ফলে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ের সমীকরণের অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়ে নতুন সমীকরণে রূপ নেবে। তাই এটা বলা কোনোভাবেই অযৌক্তিক হবে না যে, শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ভূ-রাজনীতি থেকে বিশ্ব রাজনীতির সব অঙ্গনেই প্রভাব ফেলবে। তাই বিশ্বের সকল চোখ এখন বাংলাদেশের দিকে—ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে।
*শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘিরে ডিসেম্বর এখন শুধু একটি মাস নয়, এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমীকরণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের সময় হয়ে উঠেছে।*
Columnist: Mr. Fozla Rabbi Robna