তিস্তা মহাপরিকল্পনা : বাংলাদেশের চীনমূখী ভাবনার বস্তবতা কতটুকু? - বিশ্লেষণ

তিস্তা নিয়ে এমন একটি সহজ বর্ণনা প্রচলিত আছে, যা খুব সহজেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়—ভারত দেরি করেছে, বাংলাদেশ ধৈর্য হারিয়েছে, আর সেই সুযোগে চীন এগিয়ে এসেছে। গল্পটি সরল, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার মতো জটিল ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সরল ব্যাখ্যাই প্রায়শই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে আড়াল করে

PostImage

তিস্তা মহাপরিকল্পনা : বাংলাদেশের চীনমূখী ভাবনার বস্তবতা কতটুকু? - বিশ্লেষণ


তিস্তা নিয়ে এমন একটি সহজ বর্ণনা প্রচলিত আছে, যা খুব সহজেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়—ভারত দেরি করেছে, বাংলাদেশ ধৈর্য হারিয়েছে, আর সেই সুযোগে চীন এগিয়ে এসেছে। গল্পটি সরল, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার মতো জটিল ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সরল ব্যাখ্যাই প্রায়শই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে আড়াল করে।

ঘটনাপ্রবাহটি একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ২০২৪ সালের জুন মাসেও বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, তিনি চান তিস্তা প্রকল্পটি ভারত বাস্তবায়ন করুক। তাঁর যুক্তি ছিল, যেহেতু তিস্তার উজানের প্রবাহ ভারতের নিয়ন্ত্রণে, তাই দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনায় ভারতের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, "চীন প্রস্তুত, কিন্তু আমি চাই ভারতই কাজটি করুক।" এটি এমন একজন নেতার বক্তব্য ছিল না, যিনি ভারতের ওপর আস্থা হারিয়েছেন; বরং এমন একজন নেতার বক্তব্য, যিনি নদীর বাস্তব জলবিদ্যা বুঝতেন।

এর মাত্র ২২ দিন পর ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে তাঁর সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। সেই সঙ্গে বদলে যায় তিস্তা প্রকল্পের রাজনৈতিক সমীকরণও। তিস্তা নিয়ে চীনের দিকে বাংলাদেশের ঝুঁকে পড়া ভারতের ব্যর্থতার কারণে নয়; বরং সেই সরকার ক্ষমতায় নেই, যারা ভারতকে অগ্রাধিকার দিত। নতুন সরকারের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ভিন্ন। এটিকে ভারতের ব্যর্থতা হিসেবে উপস্থাপন করা সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু তা পুরোপুরি সঠিক নয়।

যে জলবিদ্যা ইচ্ছামতো বদলানো যায় না

তিস্তা বিতর্কের এমন একটি বাস্তবতা রয়েছে, যা চীনের অর্থায়ন দিয়েও বদলানো সম্ভব নয়। তিস্তার উৎপত্তি পূর্ব হিমালয়ে। নদীটি ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ফলে তিস্তার পানি সমস্যার কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমাধান ভারতের অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়।

চীন বাঁধ নির্মাণ করতে পারে, নদী খনন করতে পারে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে, কিংবা যত খুশি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করতে পারে। কিন্তু ভারতের উজানে কী ঘটছে, সেটি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা চীনের নেই।

তিস্তা প্রকল্পের লক্ষ্য হলো বর্ষাকালে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন কমানো এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ বাড়ানো। কিন্তু এই তিনটি লক্ষ্যই শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে ভারত থেকে কতটুকু এবং কখন পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, তার ওপর। তাই কেবল বাংলাদেশের অংশে নদীকে নিয়ন্ত্রণ করে উজানের সমস্যাকে উপেক্ষা করা মানে রোগের মূল কারণ বাদ দিয়ে শুধু উপসর্গের চিকিৎসা করা।

পশ্চিমবঙ্গের জটিলতা

ভারতের সমালোচকেরা পুরোপুরি ভুল নন। তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ধরেই আটকে আছে। পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণেই আলোচনাগুলো বারবার থেমে গেছে।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যুক্তি, তিস্তা উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনরেখা। এই নদীর পানি ভাগ করে দিলে রাজ্যের পানীয় জল ও কৃষি সেচ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এটি বাংলাদেশের প্রতি ভারতের অসৎ মনোভাব নয়; বরং একটি ফেডারেল গণতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা। কোনো ফেডারেল সরকারই সংশ্লিষ্ট রাজ্যের স্বার্থ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এমন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না।

ভারতকে তিস্তা বিতর্কে একমাত্র দোষী হিসেবে দেখালে এই বাস্তবতাটি হারিয়ে যায়। বিলম্ব হয়েছে, এটি সত্য। কিন্তু সেই বিলম্বের কারণও বাস্তব। আর পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ এবং পুরো নদী অববাহিকার জন্য গ্রহণযোগ্য সমাধান শেষ পর্যন্ত ভারতকেই দিতে হবে।

চীন আসলে কী করছে?

চীনের তিস্তা প্রকল্পে আগ্রহকে শুধুমাত্র উন্নয়ন সহযোগিতা হিসেবে দেখা সরলীকরণ হবে।

বাংলাদেশের নিম্ন তিস্তা অববাহিকা ভারতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিলিগুড়ি করিডোর বা "চিকেনস নেক"-এর খুব কাছাকাছি অবস্থিত। প্রায় ২০ কিলোমিটার প্রস্থের এই সরু ভূখণ্ডই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে।

বৃহৎ নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে ব্যাপক হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ, স্যাটেলাইট তথ্য সংগ্রহ, ভূপ্রকৃতি বিশ্লেষণ, জলবিদ্যাগত মডেলিং এবং যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন হয়।

ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে চীন উত্তর বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকার সেতু, সড়ক, সামরিক সরবরাহ পথ এবং সিলিগুড়ি করিডোর সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

উত্তরে তিস্তা প্রকল্প এবং দক্ষিণে মোংলা বন্দরে চীনের উপস্থিতি একটি নতুন কৌশলগত ত্রিভুজ তৈরি করছে, যার মাঝখানে রয়েছে ভারতের চিকেনস নেক।

বেইজিং যখন বলে, তাদের সহযোগিতা কোনো "তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়", তখন তারা আসলে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রচলিত সেই ভাষাই ব্যবহার করছে, যা বড় শক্তিগুলো সাধারণত তাদের কৌশলগত অবকাঠামো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে।

বাংলাদেশের যে প্রশ্নটি করা উচিত

বাংলাদেশের চীন-নির্ভরতার বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

২০১৬ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (BRI) যোগ দেওয়ার পর বাংলাদেশে চীনের প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ ও অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পথে, যার মধ্যে ১৪ বিলিয়ন ডলার যৌথ বিনিয়োগ।

বিশ্বব্যাংকের International Debt Report 2025 অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ৪২ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশের কর্মকর্তারাও এখন স্বীকার করছেন, ঋণ পরিশোধের চাপ সরকারি অর্থনীতিকে সীমিত করে ফেলছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অনেক দেশ চীনের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের অর্থ ব্যবহার করছে পুরোনো বিদেশি ঋণ শোধ করতে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে BRI-এর ৫৯ শতাংশ প্রকল্প পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

শ্রীলঙ্কাকে হাম্বানটোটা বন্দর দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দিতে হয়েছে। পাকিস্তান CPEC-এর ঋণের ভারে বিপর্যস্ত।

এটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়; বরং নথিভুক্ত একটি প্রবণতা।

বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার রয়েছে। কিন্তু যখন কোনো দেশের বৈদেশিক ঋণ রপ্তানি আয়ের ১৯২ শতাংশে পৌঁছে যায়, তখন ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের নতুন অবকাঠামো চুক্তি স্বাক্ষরের আগে আরও সতর্ক হওয়া স্বাভাবিক।

হাসিনা ও আশ্রয়ের প্রশ্ন

ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থানকে অনেকেই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেন।

কিন্তু একটি অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশত্যাগ করা একজন সাবেক রাষ্ট্রনেতাকে নিরাপত্তা দেওয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অস্বাভাবিক নয়।

ভারত তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করেনি; কেবল তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, যাতে আইনি প্রক্রিয়া চলতে পারে।

এটিকে উসকানি বলা কঠিন; বরং এটি বহু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রচলিত একটি রীতি।

এখন কী করা উচিত?

তিস্তা প্রশ্ন অদৃশ্য হয়ে যাবে না, এবং ভারতও তা জানে।

১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গঙ্গা ও তিস্তাকে একসঙ্গে যুক্ত করে "পানিতে ন্যায্যতা"র দাবি আরও জোরালো হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে চীন যদি বিকল্প অবকাঠামোগত সহযোগিতার প্রস্তাব নিয়ে সামনে থাকে, তবে ভারতের ওপর চাপ আরও বাড়বে।

নয়াদিল্লির উচিত দ্রুত গঙ্গা চুক্তি নবায়ন এবং তিস্তা নিয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সময়সীমাবদ্ধ প্রস্তাব দেওয়া।

শেখ হাসিনার আমলে যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল—জ্বালানি পাইপলাইন, রেল সংযোগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা—তা এখনো মূল্যবান। কিন্তু এই সম্পর্ক নিজে নিজে টিকে থাকবে না।

ভারত তিস্তায় চীনের কাছে হারেনি উদাসীনতার কারণে। বরং তার ফেডারেল কাঠামোর বাস্তব সীমাবদ্ধতা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণেই এই সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যৎ অধ্যায়টি কি ভারত দ্রুত ও পরিষ্কার কৌশল নিয়ে লিখবে, নাকি সেটি এমন একটি শক্তির হাতে ছেড়ে দেবে, যার তিস্তার উজানে কোনো অবস্থান নেই এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তায় প্রকৃত কোনো স্বার্থও নেই।

চীন বাঁধ নির্মাণ করতে পারে, কিন্তু সিকিমে বৃষ্টি নামাতে পারে না।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। আর একদিন বাংলাদেশও সেটি উপলব্ধি করবে।

লেখক: রাশি রানদেভ। তিনি কানাডাভিত্তিক একজন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব দ্য আমেরিকাস থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করেছেন

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর