অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে নিয়ে বিতর্ক! ধৃষ্টতা না সংবিধানের আলোকে নাগরিক অধিকার

বিশিষ্ট অভিনেত্রী ও পরিচালক মেহের আফরোজ শাওনকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক আবারও বাংলাদেশের গণতন্ত্রের একটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে এনেছে। একজন নাগরিক কি প্রচলিত রাজনৈতিক বা সামাজিক অবস্থার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন? নাকি ভিন্নমত প্রকাশ করলেই তাঁকে কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী বা "দালাল" হিসেবে চিহ্নিত করা হবে?

PostImage

অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে নিয়ে বিতর্ক! ধৃষ্টতা না সংবিধানের আলোকে নাগরিক অধিকার


বিশিষ্ট অভিনেত্রী ও পরিচালক মেহের আফরোজ শাওনকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক আবারও বাংলাদেশের গণতন্ত্রের একটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে এনেছে। একজন নাগরিক কি প্রচলিত রাজনৈতিক বা সামাজিক অবস্থার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন? নাকি ভিন্নমত প্রকাশ করলেই তাঁকে কোনো  রাজনৈতিক দলের অনুসারী বা "দালাল" হিসেবে চিহ্নিত করা হবে?

এই প্রশ্ন শুধু মেহের আফরোজ শাওনের নয়। সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে অবস্থান নেওয়া বা ১৯৭১ সালের ইতিহাসের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা তুলে ধরা অনেক ব্যক্তি, শিল্পী, শিক্ষক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ব্যক্তিগত আক্রমণ, রাজনৈতিক তকমা এবং সামাজিক বয়কটের মুখোমুখি হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের "আওয়ামী লীগের দালাল" আখ্যা দিয়ে তাঁদের বক্তব্যকে খণ্ডন না করে ব্যক্তিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা দেখা গেছে।

বাংলাদেশের সংবিধান কিন্তু ভিন্ন কথা বলে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৯ প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা, বিবেক এবং বাক্‌ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়। একই সঙ্গে অনুচ্ছেদ ৩৭ শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং অনুচ্ছেদ ৩৮ সংগঠন বা সমিতি গঠনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। এছাড়া অনুচ্ছেদ ২৭ আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমতার কথা বলে এবং অনুচ্ছেদ ৩১ প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় ও আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করে।

অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি জুলাই আন্দোলনের প্রশংসা করুন বা সমালোচনা করুন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলুন বা অন্য কোনো রাজনৈতিক মত প্রকাশ করুন—তা কেবল মতের অমিলের কারণে তাঁর সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার ভিত্তি হতে পারে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ করবে আইন; সামাজিক চাপ বা জনরোষ নয়।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন সময়ে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জনতার চাপ, সামাজিক অবরোধ বা কথিত "মব জাস্টিস"-এর অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ আইনের শাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার বিচার আদালতে হবে; জনতার রায়ে নয়।

মেহের আফরোজ শাওনের বক্তব্যের সঙ্গে কেউ একমত বা দ্বিমত হতে পারেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়াই গণতান্ত্রিক পথ। কোনো শিল্পী, লেখক বা নাগরিককে রাজনৈতিক পরিচয়ের তকমা দিয়ে তাঁর মতপ্রকাশের অধিকার অস্বীকার করা সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি তখনই প্রমাণিত হয়, যখন জনপ্রিয় মতের পাশাপাশি অজনপ্রিয় মতও আইনের সুরক্ষা পায়। কারণ সংবিধান কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের মত প্রকাশের অধিকার রক্ষা করার জন্য নয়; ভিন্নমত পোষণকারী নাগরিকের অধিকার রক্ষার জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য।

একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্রে নাগরিকের পরিচয় তাঁর রাজনৈতিক মত নয়, তাঁর নাগরিকত্ব। আর সেই নাগরিকত্বই তাঁকে বাক্‌স্বাধীনতা, আইনের সমান সুরক্ষা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার দেয়। এই নীতিই বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি।

লেখক : এম চৌধুরী,  রাজনৈতিক বিশ্লষক ও মানবাধিকারকর্মী। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর