তিস্তার প্রকৃত প্রয়োজন: এআই, স্যাটেলাইট এবং প্রযুক্তিনির্ভর একটি চুক্তি

২০২৬ সালের ২৫ জুন রাত। দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ মানুষ যখন ঘুমিয়ে, তখন বেইজিং থেকে একটি সংক্ষিপ্ত ঘোষণা আসে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গুওইং তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে সম্মত হন

PostImage

তিস্তার প্রকৃত প্রয়োজন: এআই, স্যাটেলাইট এবং প্রযুক্তিনির্ভর একটি চুক্তি


২০২৬ সালের ২৫ জুন রাত। দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ মানুষ যখন ঘুমিয়ে, তখন বেইজিং থেকে একটি সংক্ষিপ্ত ঘোষণা আসে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গুওইং তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে সম্মত হন।

তবে এই ঘোষণায় ভারত-বাংলাদেশের বহুদিনের অমীমাংসিত তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির কোনো উল্লেখ ছিল না। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই আলোচনা স্থবির অবস্থায় রয়েছে।

আসলে এই একটি তথ্যই পুরো ঘটনার সারাংশ। যে নদী ভারত ও বাংলাদেশ চার দশক ধরে ভাগাভাগি করার চেষ্টা করছে, সেটি আজও ভাগাভাগি হয়নি। আর এই শূন্যস্থান পূরণে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত বা বাংলাদেশ নয়—চীন।

অনেকে এটিকে ভারতের কৌশলগত পরাজয় বা নিরাপত্তা সংকট হিসেবে দেখছেন। সেই দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি ভুল নয়, তবে অসম্পূর্ণ। প্রকৃত গল্পটি শুরু হয় বেইজিংয়ে নয়, রংপুরের ধানক্ষেতে—যেখানে কৃষকরা বছরের পর বছর শুকনো মৌসুমে তিস্তার পানিশূন্যতা এবং বর্ষায় আকস্মিক বন্যার সঙ্গে লড়াই করে আসছেন। তারা অপেক্ষা করেছেন দুই প্রতিবেশী দেশের সমঝোতার জন্য। কিন্তু সেই সমঝোতা না হওয়ায় অন্য কেউ এগিয়ে এসেছে।

তিস্তার সংকট মূলত পানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু ঝুঁকির সংকট। এর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কেবল ভারত ও বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর যৌথ সহযোগিতার মাধ্যমেই সম্ভব, বাংলাদেশের উন্নয়ন সিদ্ধান্তকে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখার মাধ্যমে নয়।

তিস্তা শুধু পানি নয়, জীবন বহন করে

তিস্তা বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহত্তম নদী। এর উৎপত্তি সিকিমে, এরপর পশ্চিমবঙ্গ হয়ে এটি বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। নদীর বন্যা সমভূমির বিস্তৃতি প্রায় ২,৭৫০ বর্গকিলোমিটার।

এই নদী কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, মৎস্য, গৃহস্থালি ব্যবহার এবং বিশেষ করে বোরো ধান চাষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মোট আবাদি জমির প্রায় ১৪ শতাংশ সেচ এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। উত্তরাঞ্চল, যা দেশের খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত, তিস্তার পানির ওপর নির্ভর করেই টিকে আছে।

তবে তিস্তা শুধু পানি বহন করে না। এটি উর্বর পলি বহন করে, হিমালয়ের গলিত তুষারের পানি বহন করে এবং বর্ষায় বন্যার ঝুঁকিও নিয়ে আসে।

শুকনো মৌসুমে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজে পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশ অংশে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এতে কৃষকরা সেচ সংকটে পড়েন এবং ফসলের ক্ষতি হয়।

অন্যদিকে বর্ষায় হঠাৎ উজান থেকে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ায় উত্তর বাংলাদেশে বন্যা ও নদীভাঙন দেখা দেয়।

অর্থাৎ, একই নদী বছরের এক সময় খরা এবং অন্য সময় বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই দুই সংকট একসঙ্গে সমাধান করতে না পারলে তিস্তার কোনো সমাধানই কার্যকর হবে না।

দীর্ঘ ইতিহাসের জট

ভারত ও বাংলাদেশ অন্তত ১৯৮৩ সাল থেকে তিস্তার পানি বণ্টনের চেষ্টা করছে।

সে সময় একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় ভারতের জন্য ৩৯ শতাংশ, বাংলাদেশের জন্য ৩৬ শতাংশ এবং অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ অনির্ধারিত রাখা হয়েছিল।

২০১১ সালে নতুন একটি প্রস্তাবে ভারতের জন্য ৪২.৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশের জন্য ৩৭.৫ শতাংশ পানি বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি।

ফলে বছরের পর বছর আলোচনা স্থগিত থেকেছে। ভারত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতার কথা বলেছে, বাংলাদেশ কূটনৈতিক ধৈর্য দেখিয়েছে। কিন্তু এই দীর্ঘ বিলম্বই চীনের মতো বাইরের শক্তির জন্য সুযোগ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের অনেকের কাছে তিস্তা ইস্যু এখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আন্তরিকতার পরীক্ষা।

আতঙ্ক নয়, বাস্তববাদ

ভারতের একটি বড় উদ্বেগ হলো—চীনের উপস্থিতি শিলিগুড়ি করিডরের কাছে বাড়ছে।

এই উদ্বেগ অমূলক নয়।

তবে বাংলাদেশের প্রতিটি অবকাঠামো প্রকল্পকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখলে উল্টো ভারতের অবস্থানই দুর্বল হবে।

বাংলাদেশের দৃষ্টিতে এতে এমন ধারণা আরও শক্তিশালী হয় যে, ভারত তাকে সমান অংশীদার নয়, বরং নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে।

বাস্তবতা হলো, তিস্তার পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয় হিমালয়ের তুষারগলা পানি, উজানের বৃষ্টিপাত এবং পুরো অববাহিকার ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে।

এই তথ্য কেবল ভারত ও বাংলাদেশ যৌথভাবে ভাগাভাগি করতে পারে। তাই তিস্তার স্থায়ী সমাধানও কেবল এই দুই দেশের যৌথ উদ্যোগেই সম্ভব।

প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই রয়েছে

সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো—এই সমস্যার সমাধানের প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই বিদ্যমান।

গুগলের Flood Forecasting Initiative ভারত ও বাংলাদেশের সরকারি সংস্থার সঙ্গে কাজ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে আগাম বন্যা সতর্কতা দিচ্ছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB) নাসা-ইউএসএইডের SERVIR কর্মসূচির মাধ্যমে স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করে বন্যা পূর্বাভাস উন্নত করেছে।

ভারতের Central Water Commission (CWC) বর্তমানে ৩৩০টিরও বেশি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিমোট সেন্সিং, জিআইএস এবং মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে পাঁচ দিন আগেই বন্যা পূর্বাভাস দিতে সক্ষম।

অর্থাৎ প্রযুক্তির অভাব নেই।

যা নেই, তা হলো এই প্রযুক্তিগুলোকে তিস্তা কেন্দ্রিক যৌথ ব্যবস্থায় একত্রিত করার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

একটি যৌথ "তিস্তা প্রযুক্তি অবকাঠামো"

লেখকের মতে, এই যৌথ কাঠামোর চারটি স্তর হতে পারে—

তিস্তা ডিজিটাল টুইন: পুরো নদী অববাহিকার একটি বাস্তবসম্মত ডিজিটাল মডেল, যেখানে বিভিন্ন বাঁধ, ড্রেজিং বা অবকাঠামোর সম্ভাব্য প্রভাব আগে থেকেই পরীক্ষা করা যাবে।

যৌথ এআই-ভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা: ভারত ও বাংলাদেশের তথ্য একত্র করে কৃষক, প্রশাসন এবং জনগণকে এসএমএস, অ্যাপ ও স্থানীয় ভাষায় সতর্কবার্তা দেওয়া।

যৌথ ডেটা লেক: নদীর প্রবাহ, বৃষ্টিপাত, পলি, কৃষি এবং ভূমি ব্যবহারের তথ্য দুই দেশের যৌথ মালিকানায় সংরক্ষণ করা।

কৃষকবান্ধব অ্যাপ: মৌসুমি পানি প্রবাহ, সেচ পরিকল্পনা, বন্যা ঝুঁকি এবং ফসলের পরামর্শ সহজ ভাষায় কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

এই চারটি স্তর মিলে গড়ে উঠতে পারে একটি "Teesta Intelligence" ব্যবস্থা।

প্রযুক্তি কীভাবে চুক্তিকে সহজ করবে

অনেকে মনে করেন, এআই বা প্রযুক্তি রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না। এটি সত্য- কিন্তু প্রযুক্তি একটি ন্যায্য চুক্তি তৈরি করা অনেক সহজ করে দিতে পারে।

যদি দুই দেশ একই তথ্য, একই পূর্বাভাস এবং একই বৈজ্ঞানিক মডেল ব্যবহার করে, তাহলে পানি বণ্টনের প্রশ্নটি রাজনৈতিক দর-কষাকষির পরিবর্তে একটি প্রকৌশল ও ন্যায়বিচারের আলোচনায় রূপ নেবে।

বাংলাদেশও নিশ্চিত হতে পারবে যে, উজান থেকে হঠাৎ পানি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে কি না—সব তথ্য বাস্তব সময়ে দৃশ্যমান থাকবে।

স্বচ্ছ প্রযুক্তিই কৌশলগত আস্থা তৈরি করতে পারে

ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—চীনের দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত উপস্থিতি। এই উদ্বেগের কার্যকর সমাধান হতে পারে একটি যৌথ তথ্যভিত্তিক কাঠামো।যদি সিদ্ধান্ত হয় যে, তিস্তা সম্পর্কিত যেকোনো বড় প্রকল্প—যে দেশই নির্মাণ করুক—তার সব তথ্য ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ ডেটা প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকবে, তাহলে উভয় দেশই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারবে।

এতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বও অক্ষুণ্ন থাকবে এবং ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগও অনেকটাই কমবে।

তিস্তার নতুন গল্প

দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পরীক্ষার প্রতীক হয়ে আছে।

কিন্তু এই গল্পের শেষ এখনো লেখা হয়নি।

আজ এআই, স্যাটেলাইট, ডিজিটাল মডেলিং এবং যৌথ তথ্য ব্যবস্থাপনার মতো প্রযুক্তি দুই দেশের হাতের নাগালেই রয়েছে। যা প্রয়োজন, তা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারণ নদী কোনো পতাকা চেনে না। নদীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সিকিমের তুষারগলা পানির তথ্য রংপুরের কৃষকের কাছে পানি পৌঁছানোর আগেই পৌঁছায় কি না।

ভারত ও বাংলাদেশের হাতে সেই সক্ষমতা আজ রয়েছে।

এখন সিদ্ধান্ত তাদের—তারা কি একসঙ্গে প্রযুক্তির ভিত্তিতে একটি ন্যায্য তিস্তা চুক্তি গড়ে তুলবে, নাকি দুই তীরে দাঁড়িয়ে দেখবে, অন্য কেউ নদীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে।

লেখক- ড. সুধাংশু কুমার, সিওও  এবং এআই কৌশল প্রধান - আইএডিএন, দিল্লিপিএইচডি- এআই ও নিরাপত্তানীতি।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর