জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রই ঢাকার কূটনীতির মূল অগ্রাধিকার, BRICS নয়- বলে মনে করছে সরকার
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নেতৃত্ব, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সমঝোতা এবং পশ্চিমা বাজার ধরে রাখার কৌশল—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এখন বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট। BRICS-এ যোগদানের আগ্রহ থাকলেও সেটিকে আপাতত মূল কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে দেখার মতো শক্ত প্রমাণ নেই
জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রই ঢাকার কূটনীতির মূল অগ্রাধিকার, BRICS নয়- বলে মনে করছে সরকার
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নেতৃত্ব, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সমঝোতা এবং পশ্চিমা বাজার ধরে রাখার কৌশল—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এখন বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট। BRICS-এ যোগদানের আগ্রহ থাকলেও সেটিকে আপাতত মূল কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে দেখার মতো শক্ত প্রমাণ নেই।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে BRICS নিয়ে আগ্রহ নতুন নয়। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ জোটটিতে সদস্যপদের জন্য আবেদন করেছিল। চলতি বছরের জুনে মস্কো সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের কাছে BRICS ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় (SCO) বাংলাদেশের সদস্যপদের জন্য রাশিয়ার সমর্থন চান। রাশিয়া ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার কথাও জানায়।
তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, BRICS-এর পাশাপাশি—এবং বাস্তব স্বার্থের বিচারে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে—ঢাকা জাতিসংঘের বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে এগিয়ে নিচ্ছে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের বড় কূটনৈতিক অর্জন
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্ব। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ২ জুন ২০২৬ ভোটে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে ৯৯-৯১ ভোটে পরাজিত করে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর এক বছরের মেয়াদ শুরু হবে ৮ সেপ্টেম্বর থেকে।
এটি বাংলাদেশের জন্য নিছক একটি আনুষ্ঠানিক পদ নয়। ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনার সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল প্ল্যাটফর্ম। একই অধিবেশনে জাতিসংঘ মহাসচিবের উত্তরসূরি নির্বাচনও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হয়ে উঠবে।
ফলে ঢাকার জন্য জাতিসংঘের মঞ্চটি আগামী এক বছরে বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করবে। বাংলাদেশ সেখানে শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু, টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শাসন এবং জাতিসংঘ সংস্কারের মতো বিষয় সামনে আনতে পারবে।
অর্থাৎ, BRICS যেখানে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক জোট, জাতিসংঘ সেখানে বাংলাদেশের জন্য ১৯৩ দেশের সঙ্গে একযোগে কাজ করার সর্বজনীন প্ল্যাটফর্ম।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কেন আরও গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১.৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছে প্রায় ৯.৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করেছে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলার। একই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে প্রায় ৭.১ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র শুধু রাজনৈতিক শক্তি নয়; এটি সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজার। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে শুল্ক, শ্রমমান, বাজারসুবিধা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কৌশলগত প্রয়োজন।
২০২৬ সালের বাণিজ্য চুক্তি বড় ইঙ্গিত
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝার জন্য ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির বাণিজ্য চুক্তিই যথেষ্ট।
ওয়াশিংটন ও ঢাকা একটি Reciprocal Trade Agreement-এ সম্মত হয়েছে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ১৯ শতাংশ reciprocal tariff নির্ধারণ করেছে এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ বাংলাদেশি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্যের ক্ষেত্রে শূন্য শতাংশ reciprocal tariff-এর ব্যবস্থা তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যদি সেগুলো নির্দিষ্ট মার্কিন কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি হয়।
চুক্তিতে বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য বাজারসুবিধা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে যন্ত্রপাতি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, গাড়ি ও যন্ত্রাংশ, ICT পণ্য, কৃষিপণ্য ও জ্বালানি রয়েছে।
চুক্তির পরিসর শুধু বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রম অধিকার, পরিবেশ, মেধাস্বত্ব, দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা, সরবরাহ শৃঙ্খল, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয়-অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়ও এতে রয়েছে।
এগুলো থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন কেবল কূটনৈতিক নয়—অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত।
তাহলে BRICS কোথায়?
BRICS বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানো, Global South-এর রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি এবং বিকল্প অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই BRICS-এ যোগদানের চেষ্টা করেছে এবং ২০২৬ সালের জুনে রাশিয়ার সমর্থন চেয়েছে।
এমনকি চলতি বছর ভারত বাংলাদেশকে সেপ্টেম্বরের ১৮তম BRICS সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আমন্ত্রণটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে—অর্থাৎ অংশগ্রহণের বিষয়ে তখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এখানেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দেখা যায়। ঢাকা BRICS-কে প্রত্যাখ্যান করছে না; বরং একই সঙ্গে রাশিয়া-চীনসহ Global South-এর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের সঙ্গে সম্পর্কও ধরে রাখছে।
BRICS-এর চেয়ে UN কেন আলাদা গুরুত্ব বহন করে?
বাংলাদেশের জন্য BRICS-এর গুরুত্ব মূলত অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক। কিন্তু জাতিসংঘের গুরুত্ব আরও বিস্তৃত।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন অর্থায়ন, স্বল্পোন্নত দেশের উত্তরণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য—এসব বিষয়ে বাংলাদেশের প্রধান কূটনৈতিক লড়াইয়ের জায়গা জাতিসংঘ।
আর ২০২৬-২৭ সময়ে সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব বাংলাদেশের কূটনৈতিক দৃশ্যমানতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই ঢাকার জন্য জাতিসংঘের মঞ্চে সক্রিয় থাকা কেবল মর্যাদার প্রশ্ন নয়; এটি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার অর্থ কী?
এখানেও বিষয়টি শুধু ওয়াশিংটনের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য, জ্বালানি, বিমান ও বৃহত্তর বাজারসুবিধার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে।
২০২৬ সালের বাণিজ্য চুক্তিতে ১৫ বছরের জন্য প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন জ্বালানি পণ্য কেনার সম্ভাব্য চুক্তি এবং প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা একটি বাস্তব প্রয়োজন।
তবে কি BRICS গৌণ?
সম্পূর্ণভাবে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না।
বরং বর্তমান তথ্য বলছে, বাংলাদেশের কৌশলটি সম্ভবত “একটি জোট বেছে নেওয়া” নয়, বরং “সব গুরুত্বপূর্ণ শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখা”।
একদিকে রাশিয়ার কাছ থেকে BRICS ও SCO-তে সমর্থন চাওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একই সময়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব বাংলাদেশের হাতে এসেছে।
এই তিনটি পদক্ষেপকে একসঙ্গে দেখলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য কৌশল দাঁড়ায়—
জাতিসংঘে বহুপাক্ষিক নেতৃত্ব + যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক + BRICS/Global South-এর সঙ্গে বিকল্প কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ।
সামনে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
এই ভারসাম্য রক্ষা সহজ হবে না। BRICS-এর মধ্যে চীন, রাশিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলোর ভূরাজনৈতিক অবস্থান যেমন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক, তেমনি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পশ্চিমা বাজারগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্র।
তাই ঢাকার জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা হবে—কোনো একটি শক্তির বলয়ে ঢুকে না গিয়ে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রাখা।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব সেই ভারসাম্য রক্ষায় বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও বিনিয়োগ ধরে রাখা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। BRICS আবার বাংলাদেশকে Global South-এর বিকল্প প্ল্যাটফর্মে জায়গা করে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, BRICS বাংলাদেশের কূটনৈতিক এজেন্ডায় আছে, কিন্তু এটিকে একমাত্র বা প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে দেখার মতো প্রমাণ নেই।
বরং ২০২৬ সালের বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে তিনটি অগ্রাধিকার স্পষ্ট—
প্রথমত, জাতিসংঘে নিজের কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানো;
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা;
তৃতীয়ত, BRICS ও অন্যান্য Global South প্ল্যাটফর্মকে বিকল্প কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা।
অর্থাৎ ঢাকার নীতিকে সবচেয়ে যথাযথভাবে বলা যায়—“BRICS গুরুত্বহীন বা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং “BRICS-এর পাশাপাশি জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ বহুমুখী কূটনীতি।”
এই নীতি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মতও হতে পারে, কারণ দেশের অর্থনীতি যেমন পশ্চিমা বাজারের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল, তেমনি ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতিতে Global South-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।