“চব্বিশের আন্দোলন ছিল পরিকল্পিত; সত্য একদিন প্রকাশ পাবে” — শেখ হাসিনা

ভারতের নয়াদিল্লি থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে দীর্ঘ বক্তব্যে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না; বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, যার লক্ষ্য ছিল সাংবিধানিক সরকারের পতন ঘটিয়ে নির্বাচনের বাইরে ক্ষমতার পথ তৈরি করা। তিনি দাবি করেন, আন্দোলনের আড়ালে সংঘটিত সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ ছিল পূর্বপরিকল্পিত। একই সঙ্গে তিনি বলেন, নিজের ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ বা নিরাপত্তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন; তাঁর একমাত্র উদ্বেগ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। যত বাধাই আসুক, দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন বলেও ঘোষণা দেন।

PostImage

“চব্বিশের আন্দোলন ছিল পরিকল্পিত; সত্য একদিন প্রকাশ পাবে” — শেখ হাসিনা


শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলোকে শুধুমাত্র একটি শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন হিসেবে দেখানো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার শুরু থেকেই আলোচনার মাধ্যমে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় বিষয়টির সমাধান করতে চেয়েছিল। ২০১৮ সালে সরকারই কোটা ব্যবস্থা বাতিল করেছিল এবং ২০২৪ সালে হাইকোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করলে সরকার আপিল করে আগের অবস্থান বহাল রাখার উদ্যোগ নেয়।

তিনি জানান, ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সরকারের তিনজন মন্ত্রীও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে কোটা সংস্কারের দাবিকে সরকার পতনের একদফা আন্দোলনে রূপ দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানের একটি বক্তব্যেরও উল্লেখ করেন। শেখ হাসিনার ভাষ্য অনুযায়ী, মাহমুদুর রহমান নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে এটি অত্যন্ত পরিকল্পিত একটি আন্দোলন ছিল এবং এর পেছনে একজন মূল পরিকল্পনাকারী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন। তাঁর মতে, এই বক্তব্যই প্রমাণ করে যে ঘটনাটি কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না; বরং অদৃশ্য নেতৃত্বের নির্দেশনায় পরিচালিত একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক পরিকল্পনা ছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনের বাইরে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ তৈরি করা।

তিনি আরও দাবি করেন, ১৫ জুলাইয়ের পর আন্দোলনের চরিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায় এবং দেশজুড়ে হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা শুরু হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশন, মেট্রোরেল, সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল, কারাগার, পুলিশ স্থাপনা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার কথাও তিনি তুলে ধরেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ১৬ জুলাই ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী সবুজ আলী হত্যার মধ্য দিয়ে যে হত্যাযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল, তা আজও থামেনি। তাঁর দাবি, এরপর থেকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যা, গুম, গ্রেপ্তার, ঘরছাড়া এবং মিথ্যা মামলায় হয়রানি অব্যাহত রয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, এই দমন-পীড়ন শুধু আওয়ামী লীগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, সাংবাদিক, আইনজীবী, বিচারক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, পেশাজীবী এবং সাধারণ নাগরিকরাও এর শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলারও একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা চলছে।

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। তিনি দাবি করেন, প্রবৃদ্ধি কমেছে, শিল্প উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে, বিনিয়োগ কমেছে, বেকারত্ব বেড়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

এ সময় তিনি কয়েকটি সুস্পষ্ট দাবি উত্থাপন করেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে, মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের স্বার্থে কাজ করতে হবে, ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য নয়।

বক্তব্যের শেষাংশে শেখ হাসিনা আবেগঘন ভাষায় বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে যত বাধাই আসুক না কেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাও তাঁকে থামাতে পারেনি। তিনি বলেন, নিজের ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন; তাঁর একমাত্র উদ্বেগ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তিনি বাংলাদেশে ফিরতে চান দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, কারণ জনগণ নিরাপত্তা, উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও শান্তিপূর্ণ জীবনের অধিকার রাখে।

তিনি আরও বলেন, তাঁর ফিরে আসা কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতার প্রশ্ন নয়; বরং বাংলাদেশকে আবার উন্নয়ন, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনার একটি প্রচেষ্টা। বক্তব্যের শেষেও তিনি জনগণের প্রতি আস্থা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস এবং তিনি আবারও দেশের মানুষের কাছেই ফিরে আসবেন।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর