ফ্রেশ স্টার্টের আহ্বান ঢাকার, কূটনৈতিক আশ্বাস দিল দিল্লি
ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটিয়ে নতুন সূচনার বার্তা এসেছে বাংলাদেশ থেকে। ভারতের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে সম্পর্কের উষ্ণতার পাশাপাশি বৈঠকে উঠেছে শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত চিহ্নিত পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের বিষয়টিও।
ফ্রেশ স্টার্টের আহ্বান ঢাকার, কূটনৈতিক আশ্বাস দিল দিল্লি
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে পুনর্গঠনের বার্তা দিয়েছে ঢাকা। অতীতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মতপার্থক্য পেছনে ফেলে দুই দেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে সমতা, পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা এবং নিয়মিত সংলাপের ওপর জোর দিয়েছেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজের কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ আহ্বান জানান।
সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে ফলপ্রসূ ও ইতিবাচক আলোচনা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান, সামাজিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কসহ নানা কারণে বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ককে কোনো একটি ইস্যু বা সাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর জাতীয় ও আঞ্চলিক স্বার্থের জায়গা থেকে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, অতীতকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে একটি নতুন সূচনা বা ‘ফ্রেশ স্টার্ট’ প্রয়োজন।
সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যে একই সঙ্গে ছিল সম্পর্ক উন্নয়নের প্রত্যাশা এবং ঢাকার অবস্থানের স্পষ্ট বার্তা। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য ও অমীমাংসিত ইস্যু রয়েছে। তবে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব।
তাঁর মতে, সমতার ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমেই দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। তবে এই প্রক্রিয়ায় ভারতকেও আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দিল্লির বার্তাও ইতিবাচক
জবাবে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দুই দেশের সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ভারতের প্রত্যয়ের কথা জানান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত শুধু ভৌগোলিক সীমান্তই ভাগাভাগি করে না, দুই দেশের জনগণ সমৃদ্ধির স্বপ্নও ভাগাভাগি করে।
গণতান্ত্রিক সমাজে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য ও চ্যালেঞ্জ থাকা স্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইস্যু থাকাটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্যের অংশ। তবে এসব চ্যালেঞ্জকে সম্পর্কের স্থায়ী বাধা হিসেবে না দেখে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে নেওয়া প্রয়োজন।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশের জনগণের মূল প্রত্যাশা একটি সুদৃঢ়, স্থিতিশীল ও চমৎকার সম্পর্ক, যা উভয় দেশের জন্য একটি ‘উইন-উইন’ বা পারস্পরিক কল্যাণকর পরিস্থিতি তৈরি করবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এমন কোনো জটিল ইস্যু নেই, যা আলোচনা ও কূটনৈতিক পদ্ধতিতে সমাধান করা সম্ভব নয়।
আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় ও উজ্জ্বল হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সম্পর্ক উন্নয়নের আলোচনার মধ্যেই প্রত্যর্পণ ইস্যু
তবে সৌজন্য সাক্ষাৎটি শুধু বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার বার্তায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। বৈঠকে বাংলাদেশ তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও বিচারসংক্রান্ত উদ্বেগও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিদ্যমান বন্দি বিনিময় ও প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ভারতে অবস্থানরত চিহ্নিত পলাতক অপরাধীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানান।
এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি করার লক্ষ্যে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি বিশেষভাবে উত্থাপন করা হয়।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান নতুন নয়। এর আগে মে মাসেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের কাছে একাধিকবার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে এবং দুই দেশের বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাঁকে দেশে ফেরত এনে বিচারের মুখোমুখি করতে চায়।
সোমবারের বৈঠকে এ দাবির পাশাপাশি শহীদ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদেরও ভারত থেকে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
জবাবে ভারতীয় হাইকমিশনার জানান, এ বিষয়ে ভারতীয় পক্ষ আইনগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নেবে।
অর্থাৎ, একই বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছার বার্তার পাশাপাশি বিচারিক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর বিষয়গুলোও আলোচনার টেবিলে এসেছে।
ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনপর্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা কমিয়ে নতুন করে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। ২০২৬ সালে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগও দৃশ্যমান হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশের হাইকমিশনার করা হয় এপ্রিলে। তাঁর নিয়োগকে দুই দেশের সম্পর্কের রাজনৈতিক মাত্রা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়েছে।
এর আগে জুনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর পরিচয়পত্র গ্রহণ করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে তাঁর দায়িত্বকাল বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী, ফলপ্রসূ ও জনগণের জন্য উপকারী করতে ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে, সম্পর্কের ইতিবাচক বার্তার পাশাপাশি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত নিরাপত্তা, রাজনৈতিক বক্তব্য, বাণিজ্য ও ভ্রমণসহ বিভিন্ন বিষয় ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের সংবেদনশীল জায়গা হয়ে রয়েছে।
১০ আগস্টের বৈঠকটি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। একদিকে দুই পক্ষ বলছে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে, অন্যদিকে অমীমাংসিত বিষয়গুলোও সরাসরি আলোচনার টেবিলে থাকছে।
সার্বিকভাবে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ‘ফ্রেশ স্টার্ট’ এবং ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর ‘উইন-উইন’ সম্পর্কের বক্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—ঢাকা ও দিল্লি এখন সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করছে। তবে সেই নতুন সম্পর্কের ভিত্তি কতটা সমতা, পারস্পরিক আস্থা ও বাস্তব সমস্যার সমাধানের ওপর দাঁড়াবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং ভারতীয় হাইকমিশনের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।