বাংলাদেশে যাকে উদ্ধারের দাবিতে প্রতিবাদ হয়েছিল, তাকেই খুঁজে পেল পুলিশ আত্মগোপনে
নিখোঁজ নেতা’কে ঘিরে আন্দোলন, প্রতিবাদ ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টে যায় পুরো ঘটনা। পুলিশের তদন্তে উদ্ধার হওয়া ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসান আহমেদ প্রধানের বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে ধর্ষণ ও জোরপূর্বক গর্ভপাতের মামলা।
বাংলাদেশে যাকে উদ্ধারের দাবিতে প্রতিবাদ হয়েছিল, তাকেই খুঁজে পেল পুলিশ আত্মগোপনে
ধর্ষণ ও জোরপূর্বক গর্ভপাতের অভিযোগে শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা: ‘নিখোঁজ’ দাবির পর পুলিশের তদন্তে ভিন্ন চিত্র, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকা | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক সম্পাদক জিসান আহমেদ প্রধানকে ঘিরে গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রথমে তাকে ‘নিখোঁজ’ দাবি করে দেশব্যাপী উদ্বেগ, প্রতিবাদ ও উদ্ধারের দাবিতে কর্মসূচি পালন করা হলেও পরে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে ভিন্ন তথ্য। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে এক তরুণীর করা ধর্ষণ, বিয়ের প্রলোভন এবং জোরপূর্বক গর্ভপাতের অভিযোগ নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জিসান আহমেদ প্রধানকে কেউ অপহরণ করেনি; বরং তিনি স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে ছিলেন। পরে কুমিল্লার লাকসাম এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর এক তরুণীর অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
নিখোঁজের অভিযোগ ও দেশব্যাপী প্রচারণা
ঘটনার শুরু ১১ জুন রাতে। জিসান আহমেদ প্রধান নিখোঁজ হয়েছেন দাবি করে তার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। এর পরপরই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন অফিসিয়াল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে তাকে উদ্ধারের দাবিতে ব্যাপক প্রচারণা শুরু হয়।
১২ জুন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম এবং সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ এক যৌথ বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে দাবি করা হয়, জিসানকে অপহরণ করা হয়েছে এবং অপহরণকারীরা পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করছে।
শিবিরের ওই বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করা হয় যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিচ্ছে না এবং প্রশাসনের ভূমিকা “রহস্যজনক”। এমনকি কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সে প্রশ্নও উত্থাপন করা হয়।
কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদের পাঠানো ওই প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে পরবর্তীতে পুলিশের তদন্তে অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি কিংবা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়। পুলিশ দাবি করেছে, জিসান নিজেই আত্মগোপনে ছিলেন এবং তাকে অপহরণ করা হয়নি।
পুলিশের তদন্তে উঠে আসে নতুন অভিযোগ
নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডির তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ এক তরুণীর অভিযোগের সন্ধান পায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্যমতে, কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে ওই তরুণীর সঙ্গে জিসানের পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ২০ মে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে নিজের ভাড়া বাসায় বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওই তরুণীকে ধর্ষণ করেন জিসান। পরবর্তীতে তরুণী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে তাকে গর্ভপাত করানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, গর্ভপাত না করলে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, ওষুধের মাধ্যমে ভ্রূণ নষ্টের চেষ্টা করা হয় এবং পরে শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে অতিরিক্ত ওষুধ সরবরাহ করা হয়।
পরে ওই তরুণী বিয়ের দাবি জানালে জিসান প্রথমে সম্মতি দিলেও শেষ পর্যন্ত বিয়ে এড়িয়ে আত্মগোপনে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
উদ্ধার ও মামলা
নিখোঁজ সংক্রান্ত অনুসন্ধানের সময় কুমিল্লার লাকসাম এলাকায় স্থানীয় জনগণ ও পুলিশের সহায়তায় জিসানকে উদ্ধার করা হয়।
এরপর ভুক্তভোগী তরুণী থানায় উপস্থিত হয়ে ধর্ষণ, ধর্ষণে সহযোগিতা এবং ভ্রূণ নষ্ট করার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।
দাউদকান্দি থানায় দায়ের হওয়া মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ৯(১)/৩০ ধারাসহ দণ্ডবিধির ৩১৩, ৫০৬ এবং ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেছেন, তদন্তে অপহরণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত নিজেই আত্মগোপনে ছিলেন।
নীরব শিবির, প্রশ্নের মুখে সংগঠন
ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জিসানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, সংগঠনের অফিসিয়াল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ধারাবাহিকভাবে বিবৃতি, প্রতিবাদ কর্মসূচি এবং উদ্ধারের দাবি জানালেও, পুলিশের তদন্তে ভিন্ন তথ্য প্রকাশের পর সংগঠনটির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা অবস্থান স্পষ্ট করা হয়নি।
বিশেষ করে অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগগুলোর সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া না যাওয়ার পরও সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নীরবতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে।
অনেক পর্যবেক্ষক জানতে চাইছেন, যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী প্রচারণা চালানো হয়েছিল, সেই ঘটনার বাস্তবতা প্রকাশ পাওয়ার পর সংগঠনের অবস্থান কী।
শিবিরের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী প্রচার সম্পাদক আব্দুর রহমান আফনানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,
“অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে এখনই মন্তব্য করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য আমাদের কাছে নেই। ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসানকে মাত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি গুরুতর অসুস্থ। তার সঙ্গে আসলে কী ঘটেছে, সেটিও এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। এটি আপাতত পুলিশের একতরফা বক্তব্য। তিনি সুস্থ হওয়ার পর আমরা তার সঙ্গে কথা বলব এবং প্রকৃত ঘটনা কী ঘটেছে সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে জানাব।”
জনমনে প্রতিক্রিয়া
ঘটনাটি বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
অনেক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন যে, ইসলামী মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও আদর্শিক রাজনীতির দাবিদার একটি সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ সংগঠনটির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
কেউ কেউ লিখেছেন, অতীতে অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, এখন ইসলামী ছাত্রশিবিরও একই ধরনের বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছে। ফলে সংগঠনটির নৈতিক উচ্চভূমি এবং জনগ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে অন্যদিকে, অনেকেই মনে করিয়ে দিয়েছেন যে অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়। আদালতের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তকে আইনগতভাবে দোষী বলা যায় না।
বৃহত্তর রাজনৈতিক তাৎপর্য
বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি এখন কেবল একজন নেতার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর জবাবদিহিতা, নেতৃত্বের নৈতিক মানদণ্ড এবং জনআস্থার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।
একদিকে নিখোঁজ ও অপহরণের অভিযোগ ঘিরে দেশব্যাপী প্রচারণা, অন্যদিকে পুলিশের তদন্তে আত্মগোপনের দাবি এবং পরবর্তীতে ধর্ষণ ও জোরপূর্বক গর্ভপাতের অভিযোগ— পুরো ঘটনাপ্রবাহ এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।