বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতে ৫২ হাজার কোটি বকেয়া, ব্যাংকে ৫.৯ লাখ কোটি খেলাপি ঋণ, বিশ্বব্যাংকের অনুত্তোলিত ঋণেও বাড়ছে ব্যয়
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে তিন ধরনের ঋণচাপের মুখোমুখি—জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ক্রমবর্ধমান বকেয়া, ব্যাংকিং খাতে রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অনুত্তোলিত ঋণের বিপরীতে পরিশোধ করতে হওয়া কমিটমেন্ট চার্জ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই তিন সংকট একসঙ্গে সরকারি অর্থব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত এবং উন্নয়ন ব্যয়কে চাপের মধ্যে ফেলছে
বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতে ৫২ হাজার কোটি বকেয়া, ব্যাংকে ৫.৯ লাখ কোটি খেলাপি ঋণ, বিশ্বব্যাংকের অনুত্তোলিত ঋণেও বাড়ছে ব্যয়
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে তিন ধরনের ঋণচাপের মুখোমুখি—জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ক্রমবর্ধমান বকেয়া, ব্যাংকিং খাতে রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অনুত্তোলিত ঋণের বিপরীতে পরিশোধ করতে হওয়া কমিটমেন্ট চার্জ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই তিন সংকট একসঙ্গে সরকারি অর্থব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত এবং উন্নয়ন ব্যয়কে চাপের মধ্যে ফেলছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মোট বকেয়া বিল ও দায় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে রয়েছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওনা, জ্বালানি আমদানির বিল, গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বকেয়া এবং ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের অর্থ। ডলার সংকট, উচ্চমূল্যের জ্বালানি আমদানি এবং উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান এই বকেয়া বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গত দেড় বছরে এই বকেয়া প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে, দেশের ব্যাংকিং খাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ শতাংশেরও বেশি। এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব, ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ এবং আদায়ে ব্যর্থতার কারণে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা কমছে এবং বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর ঋণ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অনুমোদিত ঋণ এখনও অনুত্তোলিত অবস্থায় রয়েছে। এসব অনুত্তোলিত ঋণের ওপর বিশ্বব্যাংক নির্ধারিত হারে কমিটমেন্ট চার্জ আরোপ করে। যদিও চার্জের হার সাধারণত বছরে ০.২৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো না গেলে এই ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, তিনটি সূচকই অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করছে। একদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বকেয়া সরকারের আর্থিক দায় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণ অনুমোদনের পরও সময়মতো ব্যবহার করতে না পারায় উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক সংস্কার এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া এই চাপ থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসা কঠিন হবে। তাদের ভাষায়, ঋণের পরিমাণের চেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—ঋণ ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ঘাটতি, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তথ্য বিশ্লষন - এস গোস্বামী, লেখক ও বিশ্লষক