এখন ইরান চালাচ্ছে কারা? কঠোরপন্থি সামরিক ‘ভ্রাতৃত্বের’ হাতে ক্ষমতা
ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা Ali Khamenei নিহত হওয়ার পর দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্র দ্রুত বদলে যায়। আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর ছেলে Mojtaba Khamenei নেতৃত্ব গ্রহণ করলেও, বিশ্লেষকদের মতে বাস্তবে ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা Islamic Revolutionary Guards Corps (আইআরজিসি)-ঘনিষ্ঠ এক ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী সামরিক গোষ্ঠীর মাধ্যমে
এখন ইরান চালাচ্ছে কারা? কঠোরপন্থি সামরিক ‘ভ্রাতৃত্বের’ হাতে ক্ষমতা
ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা Ali Khamenei নিহত হওয়ার পর দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্র দ্রুত বদলে যায়। আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর ছেলে Mojtaba Khamenei নেতৃত্ব গ্রহণ করলেও, বিশ্লেষকদের মতে বাস্তবে ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা Islamic Revolutionary Guards Corps (আইআরজিসি)-ঘনিষ্ঠ এক ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী সামরিক গোষ্ঠীর মাধ্যমে।
এই গোষ্ঠীকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন একটি “Band of Brothers” — অর্থাৎ দীর্ঘদিনের যুদ্ধসঙ্গী, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা নেটওয়ার্কভিত্তিক ক্ষমতাকেন্দ্র। এদের অধিকাংশই ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া ইরান-ইরাক যুদ্ধে একসঙ্গে লড়েছিলেন এবং পরে রাষ্ট্রের সামরিক, গোয়েন্দা ও বিচারব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে উঠে আসেন।
যুদ্ধ থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে
১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর আইআরজিসি গঠিত হয়েছিল নতুন বিপ্লবী শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করার জন্য। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় এই কমান্ডারদের অনেকেই খুব অল্প বয়সে জেনারেল পদে উন্নীত হন।
পশ্চিমা দেশগুলোর ইরাক-সমর্থন তাদের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস ও কঠোর জাতীয়তাবাদী মানসিকতা তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে তারা গোয়েন্দা সংস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিচারব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেয়। একই সঙ্গে মোজতবা খামেনির সঙ্গে দীর্ঘ ব্যক্তিগত সম্পর্ক তাদের রাজনৈতিক প্রভাব আরও শক্তিশালী করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিন্ন সামরিক-আদর্শিক নেটওয়ার্কই সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানি রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছে, যদিও দেশটির বহু শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা নিহত হয়েছেন।
ক্ষমতার কেন্দ্রের প্রধান ব্যক্তিরা
Mohammad-Bagher Ghalibaf
বর্তমানে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার গালিবাফ একসময় আইআরজিসির বিমান বাহিনীর কমান্ডার, জাতীয় পুলিশ প্রধান এবং তেহরানের মেয়র ছিলেন।
১৯৯৯ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে তিনি নিজে মোটরসাইকেলে করে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের পেটানোর কথা প্রকাশ্যে বলেছিলেন।
তবে পরবর্তীতে তিনি নিজেকে তুলনামূলক বাস্তববাদী নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানে তাঁর সরাসরি আলোচনার খবর প্রকাশিত হয়েছে। সমালোচকদের ধারণা, যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে নিজেকে শক্তিশালী জাতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি।
Ahmad Vahidi
মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় আগের কমান্ডার নিহত হওয়ার পর মার্চে আইআরজিসির নেতৃত্ব নেন ভাহিদি।
তিনি একসময় আইআরজিসির বিদেশি অভিযান শাখা ‘কুদস ফোর্স’-এর প্রথম কমান্ডার ছিলেন। তাঁর সময়েই লেবাননের Hezbollah-এর মতো প্রক্সি বাহিনী শক্তিশালী হয়।
১৯৯৪ সালে বুয়েনোস আইরেসে ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে হামলা এবং ১৯৯৬ সালে সৌদি আরবে মার্কিন বিমানঘাঁটিতে বোমা হামলার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়েছে। যদিও ইরান এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে।
Gholam-Hossein Mohseni-Ejei
ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান মোহসেনি-এজেই দীর্ঘদিন ধরে কঠোর দমন-পীড়নের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
২০০৯ সালের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ দমন, বিরোধী কর্মীদের কারাবন্দি, নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর বহু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাতেও তাঁর বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা হয়েছে।
Hossein Taeb
হোসেইন তাইয়েব ছিলেন আইআরজিসির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান। তিনি এর আগে কুখ্যাত বাসিজ মিলিশিয়া পরিচালনা করেন।
দ্বৈত নাগরিক এবং ইরানি-আমেরিকানদের আটক ও বিনিময় কূটনীতির অভিযোগ তাঁর সংস্থার বিরুদ্ধে বহুবার উঠেছে।
তাঁকে মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়। দুজনই ইরান-ইরাক যুদ্ধে একই ‘হাবিব ব্যাটালিয়ন’-এ ছিলেন।
Mohammad Ali Jafari
২০০৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আইআরজিসির প্রধান ছিলেন মোহাম্মদ আলি জাফারি।
তিনি “মোজাইক স্ট্র্যাটেজি” নামে বিকেন্দ্রীভূত সামরিক কৌশল তৈরি করেন, যার ফলে শীর্ষ কমান্ডার নিহত হলেও বাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক তৈরিতেও তাঁর বড় ভূমিকা ছিল।
Mohammad Bagher Zolghadr
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন জোলঘাদর।
তিনি সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির মিশ্রণের একটি বড় উদাহরণ। তাঁর কাজ হচ্ছে সামরিক, গোয়েন্দা, বিচার ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা।
‘একটি ভ্রাতৃত্ব’ হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গোষ্ঠীর শক্তির মূল উৎস হলো গোয়েন্দা নিয়ন্ত্রণ। তারা শুধু বিরোধীদের নজরদারি করে না, নিজেদের মধ্যেও পারস্পরিক পর্যবেক্ষণ চালায়।
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও আইআরজিসি বিশেষজ্ঞ সাঈদ গোলকারের ভাষায়, “এটি এখন এমন এক ভ্রাতৃত্বে পরিণত হয়েছে যারা পুরো রাষ্ট্র পরিচালনা করছে।”
তাঁর মতে, গোয়েন্দা তথ্য, নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক কাঠামোর গভীর জ্ঞান ব্যবহার করে এই নেটওয়ার্ক ধীরে ধীরে ইরানের প্রায় সব ক্ষমতার কেন্দ্রে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে।