আজ রামিসা, কাল কার সন্তান? নীরবতা অপরাধীদের সাহস

“আমার সন্তান শুধু বেঁচে থাকুক”—এখন অসংখ্য বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় প্রার্থনা। সাম্প্রতিক শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাগুলো সমাজে এমন এক আতঙ্ক তৈরি করেছে, যেখানে পরিবারগুলো নিজেদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিনিয়ত শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। রামিসা হত্যাকাণ্ড সেই আতঙ্ককে আরও গভীর করেছে।

PostImage

আজ রামিসা, কাল কার সন্তান? নীরবতা অপরাধীদের সাহস


বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ও নারী নির্যাতনের ধারাবাহিক ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটি সমাজের গভীরে জমে থাকা ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয়, বিচারহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। “রামিসা” আজ শুধু একটি নাম নয়—এটি হাজারো আতঙ্কিত মা-বাবার দীর্ঘশ্বাস, প্রতিটি শিশুকন্যার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিক আস্থাহীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

একটি নিষ্পাপ শিশুর ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গোটা দেশ যখন শোকাহত, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে মানুষের ক্ষোভ, হতাশা ও আতঙ্ক বিস্ফোরিত হয়েছে। কেউ প্রশ্ন তুলেছেন—“কত প্রজন্মের পাপ সঞ্চিত হলে একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়?” কেউ বলেছেন, “মেয়ে মানেই যেন লালসার শিকার হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে পৃথিবীতে আসা।” এসব কথার ভাষা হয়তো আবেগপ্রবণ, কখনো তীব্র ও নির্মম; কিন্তু এগুলোর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর সামাজিক বাস্তবতা—নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের চরম অনিশ্চয়তা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত বিকৃতির ফল নয়; এর পেছনে কাজ করে সামাজিক অসুস্থতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দীর্ঘদিনের নৈতিক অবক্ষয়। অপরাধীরা জানে—বিচার দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে যেতে পারে, সাক্ষ্যপ্রমাণ দুর্বল হয়ে যেতে পারে, কিংবা আইনের ফাঁক গলে একদিন বেরিয়ে আসা সম্ভব। ফলে ভয় বা অনুশোচনার পরিবর্তে অনেকের মধ্যে তৈরি হয় এক ধরনের দুঃসাহস।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া অসংখ্য লেখায় উঠে এসেছে মায়েদের অসহায় আতঙ্ক। এক মা লিখেছেন, তিনি তার সন্তানকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে পারেন না। সন্তান বড় হয়ে স্বাধীন হোক, সাহসী হোক—এর চেয়ে তার কাছে বড় হয়ে উঠেছে শুধু একটি বিষয়: “সে যেন বেঁচে থাকে।” এই অনুভূতি এখন অসংখ্য পরিবারের বাস্তবতা। শিশুদের খেলতে পাঠানো, আত্মীয়ের বাসায় রাখা, এমনকি পাশের ফ্ল্যাটেও একা যেতে দেওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক ভয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই ভয় কেবল মেয়েশিশুতে সীমাবদ্ধ নেই। সমাজের একাংশ এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, বিকৃত মানসিকতার অপরাধীদের কাছে কোনো শিশুই নিরাপদ নয়। ফলে পরিবারগুলো ক্রমেই নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে, সামাজিক সম্পর্কের জায়গায় জন্ম নিচ্ছে অবিশ্বাস।

নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, কেবল আইন থাকলেই হবে না; তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দেশে ধর্ষণবিরোধী আইন কঠোর হলেও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও বাস্তবায়নের দুর্বলতা মানুষের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। বহু আলোচিত ঘটনায় দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠলেও শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ মানুষ আর মামলার অগ্রগতি জানতে পারেন না। অপরাধীর পরিচয়ও সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়, কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবার বহন করে আজীবনের ক্ষত।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই সংকটের সমাধান শুধু মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব—সব স্তরে সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা। শিশুদের “গুড টাচ-ব্যাড টাচ” শিক্ষা দেওয়া, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, অনলাইন ও অফলাইনে যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও। যখন মানুষ মনে করতে শুরু করে যে আইন অপরাধ দমন করতে ব্যর্থ, তখন সমাজে ক্ষোভ ও প্রতিশোধের মানসিকতা বাড়ে। “জনসম্মুখে দ্রুত ফাঁসি”র মতো আবেগঘন দাবিগুলো মূলত সেই হতাশার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে মানুষ বিচার নয়—তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নিরাপত্তা খুঁজতে চায়।

রামিসার মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; এটি পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দেওয়া এক নির্মম প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই আমাদের শিশুদের জন্য নিরাপদ একটি দেশ গড়ে তুলতে পেরেছি?

আজ যদি এই প্রশ্নের জবাব খোঁজার বদলে আমরা কেবল ক্ষণিকের আবেগে থেমে যাই, তবে আগামীকাল হয়তো আরেকটি শিশুর নাম যুক্ত হবে একই তালিকায়। আর প্রতিবারের মতো আমরা আবারও লিখবো—“আর কত?”

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর