বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার মাঝেও চীন-ইরান বাণিজ্য সম্পর্ক স্থিতিশীল, ডার্ক ফ্লিটসহ নানা গোপন পন্থায় লেনদেন
২০২৫ সালে চীন প্রতিদিন প্রায় ১.৪ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল আমদানি করেছে, যা তাদের মোট আমদানির উল্লেখযোগ্য অংশ। ২০২৬ যুদ্ধের মধ্যে তা আরও বাড়িয়েছে চীন। এতে ইরানের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয় বজায় থাকে এবং নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তেল খাত সচল থাকে
বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার মাঝেও চীন-ইরান বাণিজ্য সম্পর্ক স্থিতিশীল, ডার্ক ফ্লিটসহ নানা গোপন পন্থায় লেনদেন
নিচে চীন কীভাবে ইরানের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে—তা নিয়ে তথ্যসূত্রভিত্তিক একটি বিস্তারিত সংবাদধর্মী প্রতিবেদন দেওয়া হলো:
চীনের সহায়তায় নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও টিকে আছে ইরানের অর্থনীতি
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানির বাজার সংকুচিত হলেও চীন এককভাবে সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানিকৃত তেলের ৮০–৯০% পর্যন্ত চীন কিনে থাকে ।
২০২৫ সালে চীন প্রতিদিন প্রায় ১.৪ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল আমদানি করেছে, যা তাদের মোট আমদানির উল্লেখযোগ্য অংশ। ২০২৬ যুদ্ধের মধ্যে তা আরও বাড়িয়েছে চীন। এতে ইরানের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয় বজায় থাকে এবং নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তেল খাত সচল থাকে।
নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে “গোপন বাণিজ্য”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন অনেক সময় সরাসরি ইরান থেকে তেল আমদানির তথ্য প্রকাশ করে না বা বিকল্প রুট ব্যবহার করে। প্রকৃত আমদানি সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে । চীন ইরান মূলত ২ ধরনের ব্যবহৃত কৌশল:
১. তৃতীয় দেশের মাধ্যমে তেল পরিবহন
২. জাহাজের পরিচয় পরিবর্তন (dark fleet)
তাছাড়াও Relebeling, Ship to Ship transfer মাঝ সমুদ্রে, জাহাজের ট্র্যাকিং সিস্টেম (AIS) বন্ধ রাখা, স্থলপথ ও আঞ্চলিক বাজারের মাধ্যমেও জ্বালানী রপ্তানী করে।
সস্তা তেলের মাধ্যমে পারস্পরিক লাভ
চীন নিষেধাজ্ঞার কারণে কম দামে ইরানের তেল কিনতে পারে—প্রতি ব্যারেলে প্রায় ৮–১০ ডলার ছাড়ে।
এতে চীন কম দামে জ্বালানি পায় এবং ইরান নিশ্চিত ক্রেতা পায়। এই “win-win” পরিস্থিতি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে।
বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানি সম্পর্ক
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীন ইরান থেকে প্রায় ৪.৪৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।
এই পণ্যের মধ্যে রয়েছে: রাসায়নিক, খনিজ, ধাতু, কৃষিপণ্য
ইরানের অ-তেল খাতও কিছুটা সচল থাকে।
যুদ্ধ ও অবরোধ পরিস্থিতিতেও চীনের ভূমিকা
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ইরান প্রতিদিন প্রায় ১.৮–২.১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে, যার বড় অংশ চীনের দিকে যাচ্ছে। এছাড়া চীনের জন্য বিপুল পরিমাণ তেল ট্যাংকারে মজুদ রাখা হয়েছে, যাতে সম্ভাব্য অবরোধ মোকাবিলা করা যায়। চীন শুধু ক্রেতাই নয়, বরং ইরানের জন্য একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে।
চীনা রিফাইনারি ও “Teapot” নেটওয়ার্ক
চীনের ছোট স্বাধীন রিফাইনারিগুলো (teapot refiners) ইরানি তেলের বড় ক্রেতা। তারা আন্তর্জাতিক চাপ কম অনুভব করে এবং সস্তা তেল কিনে লাভবান হয় । এতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকারিতা দুর্বল হয় এবং ইরানের তেল বিক্রি অব্যাহত থাকে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চীন-ইরান সম্পর্ক
বিশ্ববাজারে উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও চীন ইরানের প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে রয়ে গেছে। এমনকি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চীনের মোট সমুদ্রপথে তেল আমদানির প্রায় ১৩% ইরান থেকে আসে।
সার্বিক বিশ্লেষণ বলা যায়- চীন ইরানের বৃহৎ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মিত্র। চীন যেমন কমমূল্যে জ্বালানী আমদানী করতে পারে তেমনি নিষেধাজ্ঞার বলয় থেকে অর্থনৈতিক ভাবে টিকে থাকার পন্থা হিসেবে ইরান মনে করে। কৌশলগত মিত্র হিসেবে চীন বৈশ্বিক সকল বিধিনিষেধ কে উপেক্ষা করে ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তি করে দীঘমেয়াদে ইরানের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রেখেছে।
সংবাদ বিশ্লষন : এস গোস্বামী