জুলাই জাদুঘর নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ, সরানোর নির্দেশেও বহাল প্রকৌশলী

সিন্ডিকেট সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক প্রভাবের অভিযোগে আবারও আলোচনায় গণপূর্ত অধিদপ্তর। জুলাই জাদুঘর নির্মাণকাজে অসহযোগিতা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে। উপদেষ্টা পর্যায় থেকে তাকে সরানোর নির্দেশ থাকলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রশাসনের ভেতরে অদৃশ্য প্রভাব ও গোষ্ঠী স্বার্থের প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও প্রশাসনিক মহলে চলছে তীব্র আলোচনা।

PostImage

জুলাই জাদুঘর নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ, সরানোর নির্দেশেও বহাল প্রকৌশলী


সিন্ডিকেটে আবদ্ধ ফ্যাসিস্টের দোসররা এখনো বহাল

নূরে আলম জীবনঃ

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতামলে সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নির্মাণ ও সংস্কারের কাজের দায়িত্ব পালন করা ফ্যাসিস্টের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তার জুলাই জাদুঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে চরম অসহযোগিতা করছেন। আর এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সারওয়ার ফারুকী তাকে সরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি গণপূর্তের চলতি দায়িত্বের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী।

অজ্ঞাতকারণে ফ্যাসিস্ট সরকারের ভুত ভর করছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপর। তৎকালীন সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা, জুলাই জাদুঘরের মহাপরিচালকসহ সকলে তার বিষয়ে অভিযোগ করলেও গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীসহ অপরাপর কর্মকর্তারা তাকে রক্ষায় যথেষ্ট ভূমিকা রাখেন। যার ফলে এই কর্মকর্তার সরিয়ে দেয়ার বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি গণপূর্ত অধিদপ্তর।

গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্র বলেছে, মো. আব্দুস সাত্তার বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী একজন কর্মকর্তা। ফ্যাসিস্ট সরকারের আস্থাভাজন হওয়ায় সচিবালয়ের মতো সরকারের ‘টপ কেপিআই (কী পয়েন্ট ইনস্টলেশন)’ এর নির্মাণ, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তাকে। সে বিগত সরকারের গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফ আহমেদ ও মন্ত্রী ওবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পুরো সচিবালয় দাপিয়ে বেড়াতো। গণপূর্ত অধিদপ্তরে তার কথাই ছিল শেষ কথা। তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে সমীহ করে চলতো।

৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর আব্দুস সাত্তারকে আরো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা গণপূর্ত ঢাকা বিভাগ-২-এ পদায়ন করেন তৎকালীণ প্রধান প্রকৌশলী মো. শামীম আখতার। গত বছরের ২৮ অক্টোবর ফ্যাসিস্টের দোসর শামীম আখতারকে সরিয়ে দেয়া হলেও এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন আব্দুস সাত্তার। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীও আব্দুস সাত্তারকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে রাখছেন।

জানা গেছে, ভুয়া স্কলারশিপ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়াসহ নানা অভিযোগে খালেকুজ্জামানের নামে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে একটি ডিপি চলমান ছিল। সে সময়ে মন্ত্রণালয়ে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর পক্ষে তদ্বির করে তাঁর চাকুরি রেগুলার করায় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছিলেন আব্দুস সাত্তার। এর কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আব্দুস সাত্তারকে গুরুত্বপূর্ণ গণপূর্ত ঢাকা বিভাগ-২ থেকে সরাচ্ছেন না খালেকুজ্জামান। এই বিভাগের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গণভবনসহ আরও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব রয়েছে।

এদিকে গত ৫ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই জাদুঘরের উদ্বোধন করার কথা থাকলেও কাজ সাত্তারের অসহযোগিতায় সেটা সম্ভব হয়নি। 

নির্ধারিত সময়ের পাঁচ মাস পরেও জাদুঘরটি সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া সম্ভব হয়নি। 

জুলাই জাদুঘরের প্রাক্কলিত দরের চেয়ে অনেক বেশি খরচ করার একটি ‘লুটপাটের মচ্ছব’ পেতে বসেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার। নির্মাণ সামগ্রীর ঊধ্বমূল্যের কারন দেখিয়ে প্রকল্পের বাইরের অন্য তহবিল থেকেও খরচ করছেন। সংশ্লিষ্ট ডিভিশনের বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা থেকে এ কাজে ব্যায় করা হচ্ছে।

সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কাজ হওয়ায় ‘জুলাই জাদুঘরে’র কাজ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নয়-ছয় করেছেন এই প্রকৌশলী। তাঁর অসহযোগিতার কারনে জুলাই জাদুঘরের ইলেট্রোম্যাকানিক্যাল (ইএম) কাজে সমন্বয়হীনতা প্রকট আকারে ধারণ করেছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে তো নয়ই বাড়তি সময়েও জুলাই জাদুঘর সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

সীমিত পরিসরে উদ্বোধন: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে জাদুঘরটি সীমিত পরিসরে উদ্বোধন করা হয়েছে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের নিয়ে জাদুঘরটি পরিদর্শন করেছেন।

প্রধান উপদেষ্টার পরিদর্শন: গত ২০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাদুঘরটির চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ পরিদর্শন করেন এবং এর গুরুত্ব তুলে ধরেন।

সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত: সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি বা শেষ নাগাদ এটি জনসাধারণের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে মার্চের এই সময় নাগাদ এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকার সম্ভাবনা প্রবল।  কিন্তু এখনো উন্মোক্ত হয়নি।

এ বিষয়ে আব্দুস সাত্তার সিএসবিনিউজ'কে জানান আমার বিষয়ে আনিত অভিযোগ সত্য না। কোনো সিন্ডিকেটের সুযোগ নেই এখানে। তবে তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাথে সম্পৃক্ত কি না এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যান।