হুথি হামলায় সৌদির দুই বিমানবন্দরে নিহত তিন বিদেশি, আহত ৩৬ জন
সৌদি আরবের রিয়াদ ও আবহা বিমানবন্দরে হুথি হামলায় তিন বিদেশি নিহত এবং ৩৬ জন আহত হয়েছেন, বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা।
হুথি হামলায় সৌদির দুই বিমানবন্দরে নিহত তিন বিদেশি, আহত ৩৬ জন
সৌদি আরবের দুটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের চালানো হামলায় তিন বিদেশি নাগরিক নিহত এবং আরও ৩৬ জন আহত হয়েছেন। সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মঙ্গলবার ও বুধবার পৃথক হামলায় আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রাজধানী রিয়াদের বাদশাহ খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আক্রান্ত হয়। হুথি পক্ষও পরবর্তী সময়ে দুটি বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দায় স্বীকার করেছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আবহা বিমানবন্দরে হামলায় দুই নারী নিহত হয়েছেন। তারা মরক্কো ও আলজেরিয়ার নাগরিক ছিলেন। ওই হামলায় ২৮ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে সৌদি নাগরিক ছাড়াও বাংলাদেশি ও ফিলিপাইনের নাগরিক ছিলেন। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। অন্যদিকে রিয়াদের বাদশাহ খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় সুদানের এক নাগরিক নিহত এবং আরও আটজন আহত হন। রিয়াদে আহতদের মধ্যে পাঁচজন সৌদি নাগরিক, দুইজন মিসরীয় নাগরিক এবং একজন পাকিস্তানি নাগরিক রয়েছেন।
হামলার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা, ক্ষয়ক্ষতি এবং বিমান চলাচলের পরিস্থিতি পর্যালোচনা শুরু করেছে। জরুরি উদ্ধারকারী দল ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলো দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠায়। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাত্রী ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, রিয়াদের বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান ব্যবহার করা হয়েছে। আবহা বিমানবন্দর ও আশপাশের সামরিক স্থাপনাতেও একই ধরনের হামলা চালানোর দাবি করেছে গোষ্ঠীটি। তবে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর সামরিক দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট অবশ্য জানিয়েছে, তারা হুথিদের ছোড়া কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে এবং হামলায় ব্যবহৃত উৎক্ষেপণস্থল ধ্বংস করার অভিযান চালিয়েছে।
হামলার পর ইয়েমেনের সংঘাত আরও ভয়াবহ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কয়েক বছর ধরে চলা সংঘাতের নতুন দফায় সৌদি আরব সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী এবং হুথিদের মধ্যে লড়াই তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে লোহিত সাগরের উপকূল এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশের এলাকায় সামরিক তৎপরতা বেড়েছে। এই জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেখানে সংঘাত বাড়লে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যেও পড়তে পারে।
একই সময়ে ইয়েমেনের এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরকবাহী চালকবিহীন আকাশযান দিয়ে বিমানবন্দরটির দিকে হামলা চালানো হয়। একটি ক্ষেপণাস্ত্র রানওয়ের কাছাকাছি পড়ায় কায়রো থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজকে জেদ্দায় ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হামলার জবাবে ইয়েমেনে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাদা, হোদেইদা, আল-জাওফ ও মারিবসহ একাধিক এলাকায় হুথিদের সামরিক অবস্থান, অস্ত্রভাণ্ডার ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থল লক্ষ্য করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৮০টির বেশি হুথি সামরিক স্থাপনায় হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযানে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক লড়াই শুরুর পর দুই লাখের বেশি মানুষ দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসার সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধের কারণে ইয়েমেন আগে থেকেই বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে থাকা দেশগুলোর একটি। নতুন সামরিক অভিযান সেই সংকটকে আরও গভীর করতে পারে বলে সতর্ক করা হচ্ছে।
সৌদি বিমানবন্দরে এবারের প্রাণঘাতী হামলা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো সরাসরি বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশযান হামলা অব্যাহত থাকলে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ চলাচল, আকাশপথের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ইতোমধ্যে রিয়াদসহ কয়েকটি এলাকায় বিমান চলাচলে সাময়িক বিঘ্নের খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে বৃহস্পতিবারও রিয়াদের বাদশাহ খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে হুথিরা। তবে সর্বশেষ এই দাবির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক নিশ্চিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।