সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণ ঘিরে উত্তর কোরিয়ার কঠোর হুমকি, বাড়ছে নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা

দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাদের আহত করা মাইন বিস্ফোরণের তদন্ত প্রত্যাখ্যান করে সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনাতেও তাৎক্ষণিক পাল্টা ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছে উত্তর কোরিয়া।

সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণ ঘিরে উত্তর কোরিয়ার কঠোর হুমকি, বাড়ছে নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা

সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণ ঘিরে উত্তর কোরিয়ার কঠোর হুমকি, বাড়ছে নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা


উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা নতুন করে তীব্র হয়েছে। সীমান্তের অসামরিকীকৃত অঞ্চলে মাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হওয়ার ঘটনায় সিউলের তদন্তের ফল প্রত্যাখ্যান করে পিয়ংইয়ং সতর্ক করেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার কোনো সেনা তার ভূখণ্ডে সামান্য অংশও প্রবেশ করলে তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৬ অক্টোবর এই হুঁশিয়ারি দেয়। 

ঘটনার সূত্রপাত ২১ সেপ্টেম্বর। ওই দিন দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী অসামরিকীকৃত অঞ্চলের পশ্চিম অংশে পথ পরিষ্কার করার সময় পরপর মাইন বিস্ফোরণ ঘটে। এতে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হন। তাদের মধ্যে দুজন গুরুতরভাবে আহত হন এবং তৃতীয়জন তুলনামূলকভাবে কম আহত হন। দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনী ও জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন সীমান্ত কমান্ড যৌথভাবে ঘটনাটি তদন্ত করে। 

৫ অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক কর্তৃপক্ষ তদন্তের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে। তাদের দাবি, বিস্ফোরিত মাইনগুলো উত্তর কোরিয়ার তৈরি এবং সেগুলো পরিকল্পিতভাবে সামরিক সীমারেখার দক্ষিণ পাশে পুঁতে রাখা হয়েছিল। তদন্তে উদ্ধার হওয়া মাইনের উপাদান, বিস্ফোরণের ধরন, আহত সেনাদের শরীরে পাওয়া অংশ এবং ঘটনাস্থলের অবস্থানসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। 

দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরিত মাইনগুলোতে এমন বিস্ফোরক ও কৃত্রিম রজনজাত উপাদান পাওয়া গেছে, যা আগে উত্তর কোরিয়ার ব্যবহৃত মাইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি আরও একটি অবিস্ফোরিত মাইনও পাওয়া যায়। সামরিক সীমারেখা থেকে ঘটনাস্থল প্রায় ১০ মিটার দক্ষিণে ছিল বলে পরিমাপের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা আরও বলেছেন, মাইনগুলো মাটির কয়েক সেন্টিমিটার নিচে পুঁতে রাখা হয়েছিল এবং সেগুলো বন্যার পানিতে ভেসে এসে সেখানে জমা হওয়ার সম্ভাবনা কম। 

দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী আরও জানিয়েছে, জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন সীমান্ত কমান্ডের মূল্যায়ন অনুযায়ী মাইনগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে পুঁতে রাখা হয়েছিল এবং আনুমানিক এক বছর আগে সেগুলো স্থাপন করা হয়ে থাকতে পারে। এই তথ্যের ভিত্তিতেই সিউল ঘটনাটিকে উত্তর কোরিয়ার সীমান্ত দুর্গ নির্মাণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করেছে। 

তদন্তের ফল প্রকাশের পর দক্ষিণ কোরিয়া উত্তর কোরিয়ার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়া এবং সীমান্তের দক্ষিণ পাশে থাকা অবশিষ্ট মাইন সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানায়। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে মাইন অপসারণ অভিযান চালায়। সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়া নিজে মাইন না সরালে দক্ষিণ কোরিয়া প্রয়োজন অনুযায়ী ওই এলাকায় আরও মাইন অপসারণের কাজ চালিয়ে যেতে পারে। 

এই পদক্ষেপের পরই উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়া আসে। পিয়ংইয়ং দক্ষিণ কোরিয়ার তদন্তকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে। উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, দক্ষিণ কোরিয়া নিজেদের সামরিক কার্যক্রমের দায় উত্তর কোরিয়ার ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। পিয়ংইয়ং আরও বলেছে, সীমান্ত এলাকায় দক্ষিণ কোরিয়ার মাইন অপসারণ কার্যক্রম নিয়ে তারা কোনো ধরনের অনুমোদন দেয়নি। 

সবচেয়ে কঠোর সতর্কতাটি এসেছে সীমান্ত অতিক্রমের বিষয়ে। উত্তর কোরিয়া বলেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার কোনো সেনার জুতা বা আগুনের সামান্য স্ফুলিঙ্গও যদি তাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে, সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। অর্থাৎ, পিয়ংইয়ং সীমান্তে দক্ষিণ কোরিয়ার যেকোনো সামরিক পদক্ষেপকে সম্ভাব্য উসকানি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। 

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় সামরিক হামলা শুরু করার ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বরং হুমকিটি শর্তসাপেক্ষ দক্ষিণ কোরিয়ার বাহিনী উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ডে প্রবেশ করলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন কোনো দাবি যে উত্তর কোরিয়া ইতোমধ্যে যুদ্ধ শুরু করেছে বা তাৎক্ষণিক পূর্ণাঙ্গ হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিকে এই মুহূর্তে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়াও পরিস্থিতি আরও বাড়াতে না চাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তদন্তের ফল অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং সরকার বিভিন্ন কূটনৈতিক পদক্ষেপ পর্যালোচনা করছে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয়ভাবে পরিস্থিতির অবনতি ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। 

দুই কোরিয়ার সম্পর্ক এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের যুদ্ধ আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়নি; যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে সক্রিয় যুদ্ধ বন্ধ হয়েছিল। ফলে দুই দেশ প্রযুক্তিগতভাবে এখনো যুদ্ধাবস্থার উত্তরাধিকার বহন করছে। অসামরিকীকৃত অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম সুরক্ষিত সীমান্ত এলাকা, যেখানে বিপুলসংখ্যক সেনা, কাঁটাতারের বেড়া, নজরদারি ব্যবস্থা এবং পুরোনো ও নতুন মাইন রয়েছে। 

সাম্প্রতিক ঘটনায় উত্তেজনার আরেকটি কারণ হলো উত্তর কোরিয়ার সীমান্ত শক্তিশালী করার তৎপরতা। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে উত্তর কোরিয়া সীমান্ত এলাকায় বেড়া নির্মাণ ও মাইন পোঁতার মতো কার্যক্রম বাড়িয়েছে। চলতি বছরও এসব কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে বলে সিউল জানিয়েছে। 

এদিকে ৩ অক্টোবর উত্তর কোরিয়া একটি মধ্যম-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানোর কথাও জানিয়েছে। সাম্প্রতিক মাইন বিস্ফোরণ, সীমান্তে সামরিক নির্মাণ এবং ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার কারণে সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর