যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গ্রিসের নতুন নিরাপত্তা চুক্তি, সন্ত্রাস দমনে বাড়ছে যৌথ সহযোগিতা
যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রিস সন্ত্রাস দমন, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তায় নতুন উদ্যোগ নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গ্রিসের নতুন নিরাপত্তা চুক্তি, সন্ত্রাস দমনে বাড়ছে যৌথ সহযোগিতা
যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রিসের মধ্যে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করার জন্য নতুন একটি সমঝোতা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গ্রিস সফরের সময় বুধবার এ ঘোষণা দেন। নতুন উদ্যোগের আওতায় দুই দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। দুই দেশ মনে করছে, সীমান্তপারের অপরাধ, মানবপাচার, সন্ত্রাসবাদ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় পারস্পরিক তথ্য বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গ্রিস উত্তর আটলান্টিক জোটের দীর্ঘদিনের সদস্য এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাও রয়েছে। ফলে ইউরোপ, পূর্ব ভূমধ্যসাগর, মধ্যপ্রাচ্য এবং লোহিত সাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে গ্রিসের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। নতুন সহযোগিতার ফলে দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ আরও প্রাতিষ্ঠানিক হতে পারে।
মার্কো রুবিও বলেন, দুই দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী তথ্য আদান-প্রদানের জন্য নতুন সমঝোতা নিরাপত্তা সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করবে। গ্রিসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ গেরাপেত্রিতিসও দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছেন। নতুন উদ্যোগটি দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ কৌশলগত সংলাপের সময় সামনে আসে।
এই আলোচনায় শুধু নিরাপত্তা নয়, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নিয়েও দুই পক্ষ আলোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। গ্রিসও তার সামরিক সক্ষমতা আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। দুই দেশের আলোচনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার জন্য প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের সহায়তার কথাও উঠে এসেছে। এর লক্ষ্য দুই দেশের সামরিক বাহিনীর পারস্পরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করা।
নতুন নিরাপত্তা উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবপাচার মোকাবিলা। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে অভিবাসন প্রবাহ দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য বড় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়। গ্রিস ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইউরোপে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে অবৈধ পাচারকারী চক্রের কার্যক্রম শনাক্ত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তথ্য বিনিময়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচারকে নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে অভিবাসন এবং মানবিক আশ্রয়ের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার কাঠামোর সঙ্গেও সম্পর্কিত। ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি বৈধ অভিবাসন ও আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার রক্ষার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তাও আলোচনায় এসেছে। গ্রিসের নেতৃত্বে ইউরোপীয় একটি সামুদ্রিক উদ্যোগ লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার কাজে যুক্ত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
গ্রিসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অনুকূল হলে হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক সহায়তার বিষয়ে গ্রিস সহযোগিতা করতে পারে। তবে তিনি এটিকে একটি কার্যকর শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ গ্রিস সরাসরি কোনো সামরিক পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়নি; বরং সম্ভাব্য শান্তি প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে সহযোগিতার কথা জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে এই জলপথ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বেড়েছে। জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে এবং জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রিসের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। সামরিক বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতার সুযোগ খুঁজে বের করার বিষয়টি দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। এর ফলে অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং যৌথ সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে নতুন চুক্তিকে কোনো নতুন সামরিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রিস এরই মধ্যে একই উত্তর আটলান্টিক জোটের সদস্য। নতুন সমঝোতার মূল লক্ষ্য হলো বিদ্যমান মিত্রতার কাঠামোর মধ্যে নিরাপত্তা তথ্য বিনিময় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতা বাড়ানো। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো কোনো সময় এমন চুক্তিকে নতুন সামরিক জোট বা যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, বর্তমানে নিশ্চিত তথ্য হলো দুই দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী তথ্য বিনিময় জোরদারে একটি নতুন সমঝোতা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। গ্রিস ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক সহযোগিতার সম্ভাবনার কথা বলেছে, তবে সেটিকে শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রিস সরাসরি যুদ্ধে নামছে’ বা ‘গ্রিস যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে’ এ ধরনের দাবি এই তথ্য থেকে প্রমাণিত হয় না।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নতুন সহযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু মূলত নিরাপত্তা তথ্য, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম, মানবপাচার প্রতিরোধ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রিসের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে গ্রিস ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চাইছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রিসের নতুন সমঝোতা দুই দেশের বিদ্যমান মিত্রতাকে আরও কার্যকর করার একটি পদক্ষেপ। তাৎক্ষণিকভাবে এর সবচেয়ে দৃশ্যমান ফল হতে পারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় বৃদ্ধি। ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তায় এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে। তবে নতুন কোনো বড় সামরিক অভিযান বা যুদ্ধের ঘোষণা এই চুক্তির মাধ্যমে দেওয়া হয়নি তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি পরিষ্কার রাখা জরুরি।