হিজবুল্লাহর অর্থের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র শুধু লেবাননের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্রভাণ্ডারকে লক্ষ্য করছে না। তারা এর অর্থের উৎসও ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। ইসরায়েল মার্চে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সর্বশেষ যুদ্ধ শুরু করার সময় সামরিক বাহিনী যেসব স্থাপনাকে প্রথমে হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, সেগুলো অস্ত্রের গুদাম বা ভূগর্ভস্থ কমান্ড সেন্টার ছিল না, সেগুলো ছিল ব্যাংক
হিজবুল্লাহর অর্থের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র শুধু লেবাননের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্রভাণ্ডারকে লক্ষ্য করছে না। তারা এর অর্থের উৎসও ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। ইসরায়েল মার্চে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সর্বশেষ যুদ্ধ শুরু করার সময় সামরিক বাহিনী যেসব স্থাপনাকে প্রথমে হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, সেগুলো অস্ত্রের গুদাম বা ভূগর্ভস্থ কমান্ড সেন্টার ছিল না, সেগুলো ছিল ব্যাংক।
ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান লেবাননে দীর্ঘদিন ধরে হিজবুল্লাহর ব্যাংক হিসেবে পরিচিত এবং তাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ থাকা আল-কার্দ আল-হাসান নামের একটি গোপন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এক ডজনেরও বেশি শাখা ধ্বংস করে। এরপর আরও বিমান হামলা চালানো হয় বিভিন্ন মানি-এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানে, যেগুলোর মাধ্যমে ইরান হিজবুল্লাহকে অর্থ পাঠাত বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি হিজবুল্লাহর জন্য আয় তৈরি করত এমন গ্যাস স্টেশনও হামলার লক্ষ্য হয়।
এসব হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—হিজবুল্লাহর অস্ত্রভাণ্ডারের পাশাপাশি তাদের অর্থও এখন হামলার লক্ষ্যবস্তু।
এই বোমা হামলা ছিল ইসরায়েল, ট্রাম্প প্রশাসন এবং লেবাননের নিজস্ব সরকারের সমন্বিত আর্থিক চাপের সবচেয়ে আগ্রাসী পর্যায়ের অংশ। লক্ষ্য ছিল হিজবুল্লাহর অর্থের উৎসগুলো, বিশেষ করে ইরান থেকে আসা অর্থের প্রবাহ, বাধাগ্রস্ত করা।
যুদ্ধের কয়েক মাস আগে থেকেই লেবানন সরকার ট্রাম্প প্রশাসনের চাপে হিজবুল্লাহর অর্থ গ্রহণ ও স্থানান্তরের পথগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করছিল। এর মধ্যে ছিল বৈরুতের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন লেবাননের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে দেশটির নগদভিত্তিক অর্থনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে। অভিযোগ ছিল, হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে এই নগদ অর্থের ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে আসছে।
এখন হিজবুল্লাহ কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে বলে নথিপত্র এবং লেবানন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ সূত্রের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে।
মার্চে শুরু হওয়া যুদ্ধটি ছিল তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে দ্বিতীয় যুদ্ধ। এর আগের সংঘাতে, যা ২০২৩ সালের শেষ দিকে শুরু হয়েছিল, ইসরায়েল হিজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের নেতা হাসান নাসরাল্লাহসহ সংগঠনটির বহু শীর্ষ নেতাকে হত্যা করে।
ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের নেতারা সেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে হিজবুল্লাহর আর্থিক নেটওয়ার্কের ওপর চাপ বাড়ানোর সুযোগ দেখেন। তারা সংগঠনটির ক্ষমতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করা আর্থিক নেটওয়ার্কগুলোকে লক্ষ্য করার পাশাপাশি লেবানন সরকারের ওপর হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার চাপও বাড়ায়।
গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাত আন্তর্জাতিক মনোযোগের বেশিরভাগটাই আকর্ষণ করেছে। কিন্তু হিজবুল্লাহর ওপর এই আর্থিক চাপ হচ্ছে ইরানের মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রক্সি মিলিশিয়াদের মাধ্যমে শক্তি বিস্তারের সক্ষমতা দুর্বল করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বৃহত্তর প্রচেষ্টার একটি নীরব ফ্রন্ট।
১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের এই প্রক্সি নেটওয়ার্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।
তবে সংগঠনটির অর্থের প্রকৃত পরিমাণ গোপন থাকায় এই আর্থিক অভিযান তাদের বিস্তৃত কার্যক্রমকে ঠিক কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তা স্পষ্ট নয়। হিজবুল্লাহ ও তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরানও চাপের মুখে টিকে থাকার সক্ষমতা দেখিয়েছে। তারা সামরিকভাবে পুনরুদ্ধার করার পাশাপাশি অর্থ প্রবাহ সচল রাখার নতুন পথও খুঁজে নিয়েছে।
তারপরও হিজবুল্লাহ তাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক কল্যাণব্যবস্থা চালাতে সমস্যায় পড়েছে। এই ব্যবস্থাই লেবাননের শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের সমর্থনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
ইসরায়েলি হামলায় হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সংগঠনটি সামরিক ব্যয়কে আরও বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে।
হিজবুল্লাহর প্রধান মুখপাত্র ইউসুফ আল-জেইন মে মাসে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত কয়েক লাখ মানুষের প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাওয়ায় সংগঠনটি সমর্থকদের দেওয়ার প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে।
যুদ্ধের আগে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ইরান প্রতি বছর হিজবুল্লাহকে প্রায় ৭০ কোটি ডলার অর্থায়ন করত। এটি সংগঠনটির প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বার্ষিক বাজেটের বড় অংশ।
লেবানন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের মতে, গত এক বছরে ইরান হিজবুল্লাহকে আর্থিক সহায়তা বাড়িয়েছে। কিন্তু যুদ্ধসংক্রান্ত বিপুল ব্যয় মেটানোর জন্য সেই অর্থও যথেষ্ট নয়।
আল-জেইন বলেন, যুদ্ধের চাহিদা ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে হিজবুল্লাহর ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে সম্পদকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ব্যবহার করতে হচ্ছে। তবে তার দাবি, চাপ থাকলেও হিজবুল্লাহ তা মোকাবিলা করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ: লেবাননকে কঠোর পদক্ষেপে বাধ্য করা
হিজবুল্লাহর অর্থের বিরুদ্ধে অভিযান জোরালোভাবে শুরু হয় ২০২৪ সালের শেষ দিকে।
ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিবেশী সিরিয়ায় স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদের সরকারের পতন ঘটে। এর ফলে হিজবুল্লাহ ইরান থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
হিজবুল্লাহর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চোরাচালান রুট বন্ধ হয়ে যায় ঠিক এমন সময়ে, যখন যুদ্ধের পর সংগঠনটির পুনর্গঠন ও কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন ছিল।
দশকের পর দশক হিজবুল্লাহ লেবাননের ভেতরে কার্যত একটি ‘রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র’ পরিচালনা করেছে। তারা নিজেদের সমর্থকদের খাদ্য, বাসস্থান ও অর্থ দিয়েছে; গণমাধ্যম নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে; হাসপাতাল ও স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে; গ্যাস স্টেশন ও ওষুধ কোম্পানি থেকে আয় করেছে; এবং ইরানের আর্থিক সহায়তায় লেবাননের সরকারি সামরিক বাহিনীর চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তুলেছে।
কিন্তু সিরিয়ার স্থলপথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ইরান হিজবুল্লাহকে অর্থ দেওয়ার নতুন পথ খুঁজতে শুরু করে।
মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের এবং হিজবুল্লাহর আর্থিক কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের মতে, ইরান বৈরুতের বিমানবন্দরকে ব্যবহার করতে শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরটি কার্যত হিজবুল্লাহর নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সেখান দিয়ে ইরানি অর্থ ও অস্ত্র আসত বলে অভিযোগ রয়েছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলও সেই পথের ওপর নজর রাখছিল।
গত বছরের শুরুতে মার্কিন কর্মকর্তারা লেবানন সরকারকে ইসরায়েলের একটি সতর্কবার্তা পৌঁছে দেন। দুই লেবাননি কর্মকর্তা ও এক ইসরায়েলি কর্মকর্তার মতে, ইরান যাত্রীবাহী বিমানে করে স্যুটকেসভর্তি মার্কিন ডলার হিজবুল্লাহর কাছে পাঠাচ্ছিল। কিছু ক্ষেত্রে এসব অর্থ ইরানি কূটনীতিকরাও বহন করছিলেন বলে অভিযোগ।
এই সতর্কবার্তার পর লেবানন ইরান থেকে আসা সব ফ্লাইট স্থগিত করে। সেই নিষেধাজ্ঞা এখনও কার্যকর রয়েছে।
বিমানবন্দরে হিজবুল্লাহ-ঘনিষ্ঠ কর্মীদেরও সরিয়ে দেওয়া হয়। লেবানন কর্তৃপক্ষ সেখানে এমন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নিয়োগ করে, যারা মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেন।
গত আগস্টে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি লেবানন সফর করেন। সে সময় লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম-এর সঙ্গে তার বৈঠক দেশটির পরিবর্তিত অবস্থান স্পষ্ট করে।
সালাম বলেন, ইরানিদের প্রতি লেবাননের বার্তা ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার—লেবাননের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ইরানকে হস্তক্ষেপ করতে দেওয়া হবে না।
কয়েক মাস পর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধে লারিজানি নিহত হন।
লেবাননের নগদ অর্থনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো
এরপর ওয়াশিংটন লেবাননের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিকে নজর দেয়।
লেবাননের অর্থনীতি অনেকটাই নগদনির্ভর। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অভিযোগ, হিজবুল্লাহ অবৈধ অর্থ বৈধ করার এবং ইরান থেকে অর্থ আনার কাজে এই নগদভিত্তিক অর্থনীতিকে ব্যবহার করেছে।
গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন নতুন লেবাননি কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর নিয়োগের প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে বলে একজন জ্যেষ্ঠ লেবাননি কর্মকর্তা জানান।
নতুন গভর্নর করিম সুয়েইদ দ্রুত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থান নেন।
তিনি সংগঠনটির সঙ্গে সম্পর্ক থাকার সন্দেহে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেন বা বরখাস্ত করেন। নজরদারি নিয়ে আশঙ্কার কারণে নিজের দপ্তরে গোপন শ্রবণযন্ত্র খোঁজার ব্যবস্থা করেন এবং ব্যাংকের দেওয়া কম্পিউটার ব্যবহার করতেও অস্বীকৃতি জানান।
নতুন মার্কিন-সমর্থিত গভর্নরের অধীনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের বৃহত্তম মানি-সার্ভিস ব্যবসাগুলোর তদন্ত শুরু করে। অভিযোগ ছিল, এসব প্রতিষ্ঠান হিজবুল্লাহর অর্থ স্থানান্তরে ব্যবহৃত হতে পারে।
তদন্ত শুরু হওয়ার পর লেবাননের কর্তৃপক্ষ অর্থ স্থানান্তরের ওপর নজরদারি আরও কঠোর করেছে।
সাবেক মার্কিন ট্রেজারি কর্মকর্তা ব্রায়ান ই. নেলসন বলেন, হিজবুল্লাহ এসব নেটওয়ার্কের অপব্যবহারের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে বিপুল অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম হয়েছিল।
তবে হিজবুল্লাহর মিডিয়া অফিস এই অভিযোগকে ‘মিথ্যা ও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
বড় মানি-সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ার পর হিজবুল্লাহ অপেক্ষাকৃত কম নিয়ন্ত্রিত এক্সচেঞ্জ হাউসের নেটওয়ার্কের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে শুরু করে।
একজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ও হিজবুল্লাহর আর্থিক কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত আরেক ব্যক্তি জানান, ইরান এখন এই পথেই সংগঠনটিকে অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তাদের মতে, অর্থ ইরান থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক ও ইরাক হয়ে হাওয়ালা নামের অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থার মাধ্যমে যায়। এই ব্যবস্থায় প্রকৃত নগদ অর্থ সীমান্ত অতিক্রম না করেও এক দালালের কাছ থেকে অন্য দালালের কাছে হিসাব স্থানান্তর করা সম্ভব।
গত নভেম্বরে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ লেবাননের কয়েকজন অর্থ বিনিময়কারীকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে। তখন তারা জানায়, ওই বছর ইরান ইতিমধ্যে হিজবুল্লাহকে প্রায় ১০০ কোটি ডলার পাঠিয়েছিল, যার বড় অংশ হাওয়ালা ব্যবস্থার মাধ্যমে গেছে।
হিজবুল্লাহর ‘প্রধান আর্থিক উপদেষ্টা’ হিসেবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের বর্ণিত এবং নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা অর্থ বিনিময়কারী হাসান মোকাল্লাদ নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, আন্তর্জাতিক চাপের কারণে অর্থ স্থানান্তর কঠিন হয়ে উঠেছে, তবে হিজবুল্লাহ নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে।
তার ভাষায়, লেবাননের মতো একটি দেশে, যেখানে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের প্রচলন রয়েছে, অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ সবসময়ই থাকবে।
আর্থিক চাপের প্রভাব টের পাচ্ছে হিজবুল্লাহ
আর্থিক অভিযান যত জোরালো হয়েছে, হিজবুল্লাহর সামাজিক কল্যাণব্যবস্থায়ও তার প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে।
হিজবুল্লাহর কর্মকর্তা ও সুবিধাভোগীরা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, সংগঠনটির কয়েক হাজার যোদ্ধাকে বেতন দেওয়া মোটামুটি অব্যাহত থাকলেও কিছু সামাজিক সেবা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সংগঠনটি এখন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করছে।
হিজবুল্লাহ যেখানে পারছে সেখান থেকেই নগদ অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছে।
ফেব্রুয়ারিতে, সর্বশেষ ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ জানায় যে আল-কার্দ আল-হাসানের শীর্ষ কর্মকর্তারা অর্থ সংগ্রহের জন্য একাধিক স্বর্ণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের পর্যালোচনা করা হিসাবপত্র এবং হিজবুল্লাহর নগদ অর্থনীতির ওপর নজর রাখা বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, গত এক বছরে স্বর্ণ বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
হিজবুল্লাহ স্বর্ণকে নগদে রূপান্তর করতে চেয়েছিল—এর একটি কারণ হলো, ইসরায়েলি বিমান হামলায় তাদের বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণের মজুতের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে বলে মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানান।
গত বছর লেবানন দেশটির ব্যাংক ও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আল-কার্দ আল-হাসান-এর সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ করে। এর ফলে হিজবুল্লাহ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
লেবাননের লাখ লাখ মানুষ, যাদের অনেকেই হিজবুল্লাহর সমর্থক, সুদমুক্ত ঋণ এবং যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণের জন্য আল-কার্দ আল-হাসানের ওপর নির্ভর করেন।
সংগঠনটি নিজেদের একটি দাতব্য ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করে, ব্যাংক হিসেবে নয়। এর পরিচালকও দাবি করেছেন, হিজবুল্লাহর সাংগঠনিক অর্থ আলাদা।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন এখন লেবানন সরকারকে প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে।
দক্ষিণ লেবাননের ট্যাক্সিচালক হাসানের মেয়ের স্বামী সাম্প্রতিক যুদ্ধে নিহত এক হিজবুল্লাহ যোদ্ধা। হাসান জানান, নিহত যোদ্ধাদের পরিবারের জন্য নির্ধারিত ভাতা তার মেয়ে এখনও পাচ্ছেন। কিন্তু সংগঠনটি এখন কিছু চিকিৎসা ব্যয়ের দায়িত্ব নিচ্ছে না।
যুদ্ধের কারণে যাদের বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে, তাদের হাজার হাজার পরিবারের মতো হাসানও এখনও প্রতিশ্রুত আর্থিক সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছেন।
২০২৪ সালের যুদ্ধের পর হিজবুল্লাহ ঘোষণা করেছিল, আল-কার্দ আল-হাসান ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রতিটি বাড়ির পরিবারের জন্য ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার ডলার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেবে।
কিন্তু হিজবুল্লাহর মুখপাত্র আল-জেইনের মতে, বারবার বিলম্বের পর সেই ক্ষতিপূরণ প্রদান এখন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
হাসান বলেন, “তারা পুরোপুরি নীরব।”