সৌরশক্তির পথে বাংলাদেশ, প্রধানমন্ত্রীর নতুন নির্দেশ

জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় পদক্ষেপ—গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনে পর্যায়ক্রমে সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

PostImage

সৌরশক্তির পথে বাংলাদেশ, প্রধানমন্ত্রীর নতুন নির্দেশ


বাংলাদেশকে জ্বালানি স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে নিতে সরকারি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, বিদ্যুতের ওপর চাপ কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলোতে পর্যায়ক্রমে সৌর প্যানেল (সোলার পিভি) স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সৌরবিদ্যুৎ-সংক্রান্ত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় তিনি এ নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে একাধিক নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ এখনও আমদানিকৃত জ্বালানি তেল, এলএনজি ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেলেই দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। এই বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া শুধু পরিবেশগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সভায় প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন। প্রথমত, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলোতে ধাপে ধাপে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হবে। দ্বিতীয়ত, দেশে সোলার ইনভার্টার উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের জন্য সৌরবিদ্যুৎকে আরও সাশ্রয়ী, সহজলভ্য এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করতে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক মডেল প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে বঙ্গভবন, তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জাতীয় সংসদ ভবন, বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন ভবনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় সৌর প্যানেল স্থাপনের কাজ শুরু হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি ভবনে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার শুরু হলে সাধারণ মানুষও এই প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত হবে। রাষ্ট্র নিজেই যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াবে, তখন ব্যক্তি, আবাসিক ভবন, শিল্পকারখানা এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোও একই পথে এগিয়ে আসবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে বিকল্প উৎস শক্তিশালী হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৌরবিদ্যুতের সফল ব্যবহার দেশের জন্য একটি কার্যকর মডেল তৈরি করতে পারে। পরবর্তীতে একই মডেল অনুসরণ করে আবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক ভবন ও শিল্পকারখানায় ব্যাপকভাবে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগও তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঠামোকে আরও বৈচিত্র্যময় করবে।

সভায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ও ওয়ালটন গ্রুপ পৃথক উপস্থাপনায় আবাসিক ভবনে সৌর প্যানেল স্থাপন, উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সম্ভাবনা এবং এ খাতের অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো তুলে ধরে।

তাদের উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পের বিকাশ, দেশীয় প্রযুক্তি উৎপাদন, নতুন বিনিয়োগ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

সভায় আরও জানানো হয়, আধুনিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে এয়ার কন্ডিশনার, ফ্যান, লিফটসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র সহজেই পরিচালনা করা সম্ভব। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সৌরবিদ্যুতের অর্থনৈতিক সুবিধা, বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় এবং দীর্ঘমেয়াদি লাভজনক দিকগুলো আরও ব্যাপকভাবে প্রচারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ যদি ধারাবাহিকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে পারে, তাহলে আগামী এক দশকে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে বড় একটি পদক্ষেপ নিতে পারবে। যদিও বাস্তবে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভরতা শূন্যে নামিয়ে আনা নানা প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক কারণে কঠিন, তবুও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক বিস্তার সেই নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী, তওহিদুল আহাদ, ওয়ালটন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম মাহবুবুল আলমসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর