৪৫ বছর পর জিয়া হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গঠিত কমিশনের প্রতিবেদন ৪৫ বছর পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এসেছে। দীর্ঘদিন অপ্রকাশিত থাকা এই প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডের পটভূমি, বিদ্রোহের পরিকল্পনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
৪৫ বছর পর জিয়া হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে
বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন অবশেষে ৪৫ বছর পর প্রকাশ্যে এসেছে। ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জমা দেওয়া হলেও প্রতিবেদনটি কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। সম্প্রতি কমিশনের সভাপতির স্বাক্ষরযুক্ত একটি কপি প্রকাশ্যে আসলে এসব তথ্য প্রকাশ পায়।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন।
ঘটনার এক সপ্তাহ পর, ৬ জুন ১৯৮১, তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করেন। কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি রুহুল ইসলাম। অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি আবু তাহের মোহাম্মদ আফজাল এবং খুলনার জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ সিরাজউদ্দিন আহমেদ।
কমিশনের দায়িত্ব ছিল হত্যাকাণ্ডটি কোনো ষড়যন্ত্রের ফল কি না, কারা এতে জড়িত ছিল, তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং কীভাবে পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল—এসব বিষয় তদন্ত করা।
প্রতিবেদনে ঘটনার পর সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপও তুলে ধরা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সারাদেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। একই সঙ্গে সেনাবাহিনী, বিডিআর ও পুলিশ সাংবিধানিক সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে।
তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বিদ্রোহী কর্মকর্তা মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর এবং তার অনুসারীদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। আত্মসমর্পণের সময়সীমা বাড়ানো হলেও বিদ্রোহ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদ্রোহী বাহিনী প্রথমে রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে এবং পরে সার্কিট হাউস ছেড়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুরো ভবনে শত শত গুলি ছোড়া হয়েছিল এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়।
তৎকালীন ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ব্যক্তিগত সচিব কর্নেল মাহফুজ, তৎকালীন মহিলা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আমেনা রহমানসহ একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনাও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে। তারা জানান, সার্কিট হাউসজুড়ে ব্যাপক গোলাগুলি চললেও কয়েক মিনিটের মধ্যেই হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
এছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, সরকার বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট-এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির মরদেহ হস্তান্তরের অনুরোধ জানালেও বিদ্রোহী নেতা মেজর জেনারেল মঞ্জুর তা প্রত্যাখ্যান করেন। সে সময় সরকার এটিকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন অপ্রকাশিত থাকা এই তদন্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে এখনও সমসাময়িক সরকারি নথি, সংবাদপত্র, ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ এবং অন্যান্য আর্কাইভ আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।