শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনুমতি নেই বলছে ভারত। তবে ভূরাজনীতি কি বলছে ভিন্ন কোনো গল্প?

ভারত সরকার বলছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবিক কারণে ভারতে অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য নয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধও এখনও আইনগত প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনাধীন। তবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, ১৯৭১ সালের ইতিহাস, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে প্রশ্ন উঠছে, ভারতের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের বাইরে আরও বৃহত্তর নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বাস্তবতা কি কাজ করছে?

PostImage

শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনুমতি নেই বলছে ভারত। তবে ভূরাজনীতি কি বলছে ভিন্ন কোনো গল্প?


ভারতের লোকসভায় উপস্থাপিত পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডিং কমিটি অন এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স-এর নবম প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে ভারতের ভূখণ্ড রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণ অনুরোধ আইন অনুযায়ী পরীক্ষা করা হচ্ছে।

ভারত সরকার বলছে, জীবননাশের আশঙ্কা বা বিশেষ মানবিক পরিস্থিতিতে আশ্রয় দেওয়া তাদের দীর্ঘদিনের নীতির অংশ। সেই নীতির ভিত্তিতেই শেখ হাসিনাকে ভারতে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

তবে এই সরকারি অবস্থানের পাশাপাশি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে শুধু কূটনৈতিক বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখে দেখা যায় না বলে মনে করেন অনেক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

বাংলাদেশ ও ভারত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত ভাগাভাগি করে। প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত, আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য, নদী, অভিবাসন, নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয়।

ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক। ভারতের পশ্চিমে পাকিস্তান, উত্তরে ও উত্তর-পূর্বে চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ রয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর, যা বর্তমানে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ইতিহাসও এই সম্পর্কের একটি বড় ভিত্তি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণকে সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সহায়তা দেয়। সেই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই পূর্ব পাকিস্তানের অবসান ঘটে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়।

এরপর থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ধরন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। বিশেষ করে গত দেড় দশকে নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন, সংযোগ, জ্বালানি ও বাণিজ্যে দুই দেশের সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

এই প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ভারতের কাছে বাংলাদেশে এমন একটি সরকার গুরুত্বপূর্ণ, যার সঙ্গে দিল্লি কার্যকর নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতা বজায় রাখতে পারে। তাদের মতে, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এই মূল্যায়নের অন্যতম ভিত্তি।

অন্যদিকে, সমালোচকরা বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রনীতি মূলত রাষ্ট্রের স্বার্থকেন্দ্রিক। ফলে নয়াদিল্লি যেকোনো বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গেই কাজ করার চেষ্টা করবে, যদি সেই সরকার ভারতের নিরাপত্তা, সীমান্ত স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক স্বার্থকে বিবেচনায় রাখে।

এদিকে শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করলেও অনলাইনে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিবৃতি প্রদান এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিষয়ে ভারত এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগেই জানিয়েছে, বিষয়টি বিদ্যমান আইন ও দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচনা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে লোকসভায় উপস্থাপিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ভারতের আনুষ্ঠানিক অবস্থানকে পুনর্ব্যক্ত করলেও, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ মূল্যায়নে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, ইতিহাস, ভূরাজনীতি এবং পারস্পরিক কৌশলগত স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেই বিশ্লেষকদের অভিমত।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর