উচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হলেও বড় ধরনের ভূমিকম্প মোকাবিলায় এখনো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গড়ে ওঠেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে ঢাকায় ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে দুর্বল অবকাঠামো, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সীমিত উদ্ধার সক্ষমতার কারণে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটতে পারে।
উচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ
ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও পরিকল্পনা হলেও বাস্তব প্রস্তুতিতে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী এ অঞ্চলে প্রতি ১০০ থেকে ১২৫ বছর পরপর ৭ মাত্রার এবং ২৫০ থেকে ৩০০ বছর পরপর ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তি ঘটে। গত এক শতকে এ অঞ্চলে বড় কোনো ভূমিকম্প না হওয়ায় ভবিষ্যতে শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালের নভেম্বরে নরসিংদীতে হওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাসমূলক কম্পন (Foreshock) হতে পারে।
বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সহ-সভাপতি অধ্যাপক মুনাজ আহমেদ নূর বলেন, আগে ধারণা করা হতো বড় ভূমিকম্পের উৎস হবে মধুপুর ফল্ট। কিন্তু নরসিংদীর ভূমিকম্প দেখিয়েছে ঢাকার কাছাকাছি থেকেও ৫ বা ৬ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি হতে পারে, যা রাজধানীর জন্যও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাভূমি ভরাট, দুর্বল ভবন নির্মাণ এবং বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
এদিকে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গড়ে তোলা Urban Safety and Resilience Institute (USRI) এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। প্রায় ৫৬৮ কোটি টাকার প্রকল্পে অত্যাধুনিক ভবন ও ভূমিকম্প-ঝুঁকি নিরূপণের যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হলেও জনবল নিয়োগ না হওয়ায় সেগুলো কার্যত অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।
রাজউকের এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৩,২০০টির বেশি ভবনের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সময়মতো চালু হলে এখন পর্যন্ত ঢাকার ১০ হাজারের বেশি ভবন পরীক্ষা করা সম্ভব হতো।
রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত চালুর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং কার্যক্রম শুরু হলেই ভবনের ভূমিকম্প-সহনশীলতা মূল্যায়ন শুরু হবে।
অন্যদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর (DDM) জানিয়েছে, ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রম জোরদারে ফায়ার সার্ভিস, সশস্ত্র বাহিনী এবং অন্যান্য সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ জাহেদ কামাল জানান, ৬০ সদস্যের বিশেষ উদ্ধার দল, বিভাগীয় পর্যায়ে অতিরিক্ত রিজার্ভ টিম এবং ৬২ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫ হাজারের প্রশিক্ষণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল উদ্ধার সরঞ্জাম নয় জনসচেতনতা, নিয়মিত মহড়া, বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন এবং কার্যকর দুর্যোগ-পরবর্তী পরিকল্পনা ছাড়া বড় ভূমিকম্প মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।