মানবাধিকার শুধু একটি শব্দ নয়, এটি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার

“বাংলাদেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এখনও অনেক পথ বাকি। সচেতনতার অভাব, বিচারপ্রাপ্তির জটিলতা এবং প্রান্তিক মানুষের কাছে মানবাধিকার সেবা পৌঁছে দিতে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা দূর করতে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।” এমন মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও ডিটেকটিভ নিউজ সোসাইটির চেয়ারম্যান এম সাঈদ চৌধুরী। সংগঠনটির ১০ম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোমেটিক জোনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি মানবাধিকার সুরক্ষায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।

PostImage

মানবাধিকার শুধু একটি শব্দ নয়, এটি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার


মানবাধিকার কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা বা আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়; এটি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার একটি চলমান প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষায় ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও এখনও বিচারপ্রাপ্তির জটিলতা, আইনি সচেতনতার ঘাটতি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।”— এমন মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও ডিটেকটিভ নিউজ সোসাইটির চেয়ারম্যান এম সাঈদ চৌধুরী

রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোমেটিক জোনের ৬৬, পার্ক রোডে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও ডিটেকটিভ নিউজ সোসাইটির (International Human Rights and Detective News Society) ১০ম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে আয়োজিত বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

চেয়ারম্যান এম সাঈদ চৌধুরী বলেন, গত এক দশকে সংগঠনটি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক ন্যায়বিচার, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে আসছে। বিভিন্ন সময়ে নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরা, আইনি সহায়তার বিষয়ে পরামর্শ প্রদান এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরিতে সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে মানবাধিকার নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও বাস্তবতার সঙ্গে সেই কার্যক্রমের আরও গভীর সংযোগ প্রয়োজন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এখনও অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। অনেক ভুক্তভোগী জানেন না কোথায় অভিযোগ করবেন, কীভাবে ন্যায়বিচার চাইবেন কিংবা কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে সহায়তা পাবেন। ফলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দায়িত্ব শুধু বিবৃতি দেওয়া বা কর্মসূচি পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বরং মানুষের দোরগোড়ায় আইনি সচেতনতা, তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান এবং বাস্তব সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যম মানবাধিকার রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সমাজের অসঙ্গতি, দুর্নীতি, বৈষম্য এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো সামনে নিয়ে আসে। তাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং মানবাধিকার সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে সত্য উদঘাটন এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পথ আরও সহজ হয়।

চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। সাইবার অপরাধ, অনলাইন হয়রানি, তথ্যের অপব্যবহার, শিশু ও নারীর ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং মানবপাচারের মতো নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবাধিকার কার্যক্রম গড়ে তোলা সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে সংগঠনটি গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেবে।

তিনি জানান, আগামী দিনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আইন বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধি করে বৈশ্বিক পর্যায়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি বিভাগ ও জেলায় সংগঠনের কার্যক্রম সম্প্রসারণ, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সেল গঠন, তরুণদের প্রশিক্ষণ, আইনি সহায়তা কার্যক্রম এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি আরও জোরদার করা হবে।

এম সাঈদ চৌধুরী বলেন, একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, শ্রমিকের অধিকার, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণদের মর্যাদা এবং প্রতিটি নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হলেই একটি সত্যিকার অর্থে মানবিক ও উন্নত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

তিনি মানবাধিকার আন্দোলনে তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্বে আনতে হবে। তাদের মানবাধিকার, সংবিধান, আইনি জ্ঞান এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করতে পারলে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ গড়ে উঠবে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরে সংগঠনের প্রয়াত সদস্যদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং তাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়।

অনুষ্ঠানে সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক, আইনজীবী, সমাজসেবী এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা বলেন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, সুশাসন নিশ্চিতকরণ, সামাজিক দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় স্বাধীন ও দায়িত্বশীল মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভূমিকা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সংগঠনটির ১০ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটা। পরে অতিথিদের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। সৌহার্দ্যপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয় এবং দেশ ও মানুষের কল্যাণে আরও বিস্তৃত পরিসরে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

CSB NEWS USA-এর সঙ্গে আলাপকালে সংগঠনের নেতারা জানান, আগামী দিনে আন্তর্জাতিক মানের মানবাধিকার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ, প্রান্তিক মানুষের জন্য আইনি সহায়তা সহজলভ্য করা এবং মানবাধিকার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশব্যাপী আরও বিস্তৃত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর