বর্তমান সরকার, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ও দেশে ফেরা—এক সাক্ষাৎকারে সব উত্তর!
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে কথা বলে যাচ্ছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবার ইন্ডিয়ান আউটলুক-কে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের বর্তমান অবস্থা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং নিজের রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।
বর্তমান সরকার, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ও দেশে ফেরা—এক সাক্ষাৎকারে সব উত্তর!
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। দেশ ছাড়ার পর থেকে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আঞ্চলিক কূটনীতি, গণতন্ত্র, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং নিজের রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বক্তব্য দিয়ে আসছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় ভারতের ইন্ডিয়ান আউটলুক-কে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক সৌরভ শর্মা। দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অন্তর্বর্তী সরকার, বর্তমান বিএনপি সরকার, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক, চীন সফর, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন, নিজের দেশে ফেরার পরিকল্পনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুতর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এটি শুধু সরকার পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রের চরিত্র, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্ন। তিনি দাবি করেন, তাঁর সরকারের সময় বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, উন্নয়নমুখী ও নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বর্তমানে দেশ ভয়, সহিংসতা, প্রতিশোধের রাজনীতি, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং ক্রমবর্ধমান চরমপন্থার মুখোমুখি হয়েছে। এসব পরিস্থিতির জন্য তিনি বাংলাদেশের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনীতিকে দায়ী করেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিটি সরকারের নিজস্ব কূটনৈতিক অগ্রাধিকার নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। তবে সেই অগ্রাধিকার ইতিহাস, ভূগোল, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তাঁর মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে ভারতের কাছে কখনোই ভুল বার্তা যাওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল দুটি সরকারের সম্পর্ক নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধ, রক্তের ঋণ, নিরাপত্তা, ভূগোল এবং দুই দেশের জনগণের ঐতিহাসিক বন্ধনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের উচিত চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ সব বন্ধু রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।
বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। তাই পাকিস্তানের সঙ্গে যেকোনো সম্পর্কই ইতিহাসের সত্যকে স্বীকার করার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে কূটনৈতিক সম্পর্কের আড়ালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে এবং পাকিস্তানপন্থী শক্তিকে পুনর্বাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ানোর প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
ভারত-বাংলাদেশ নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, তাঁর সরকারের সময় গঙ্গার পানি বণ্টন, স্থলসীমান্ত চুক্তি, সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, ট্রানজিট, শরণার্থী প্রত্যাবাসন এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস এবং বর্তমান সরকারের সময়ে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য চুক্তি হয়নি। তাঁর মতে, বাংলাদেশে উগ্রবাদ বৃদ্ধি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা এবং ভারতবিরোধী রাজনীতি রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পূর্বের অর্জনগুলো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, শুধু তাঁর বক্তব্য নয়, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি ও প্রগতিশীল মূল্যবোধের পক্ষে যারা কথা বলেন, তাদের সবাইকে জনজীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিবর্তে দেশে ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও অভিনয়শিল্পীরা মিথ্যা মামলা কিংবা উগ্রবাদী হামলার শিকার হচ্ছেন।
দেশে ফেরার প্রসঙ্গে তিনি পুনরায় বলেন, তিনি চলতি বছরেই বাংলাদেশে ফিরবেন। তাঁর ভাষায়, দেশের মানুষ কষ্টে আছে এবং তিনি তাদের পাশে দাঁড়াতে চান। তিনি দাবি করেন, অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তীতে গঠিত বর্তমান বিএনপি সরকার দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দেশে আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, দলটি বর্তমানে কঠিন সময় পার করলেও এটি আত্মশুদ্ধির একটি প্রক্রিয়া। তিনি বলেন, যারা আদর্শের জন্য দলে এসেছেন তারা আরও দৃঢ়ভাবে পাশে রয়েছেন, আর ব্যক্তিস্বার্থে রাজনীতিতে আসা অনেকেই নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করেছেন। গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এলে নতুন কাউন্সিলের মাধ্যমে দল পুনর্গঠন এবং তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
ভারতে অবস্থান প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ভারত তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান, মর্যাদা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করেছে। তিনি ভারতের জনগণ ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, ১৯৭১ সালের মতো কঠিন সময়েও ভারত বাংলাদেশের পাশে ছিল। একই সঙ্গে তিনি জানান, তিনি নিয়মিত পরিবার, দলীয় নেতা-কর্মী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিংবা জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, সব ধরনের কূটনৈতিক বা ব্যক্তিগত যোগাযোগ প্রকাশ্যে আলোচনা করা যায় না। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, ভারতের নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ভারতের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
নিজের শেষ দিকের শাসনামল সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাঁর সরকারের সময় সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন মাধ্যম, টকশো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত সমালোচনা হয়েছে। তিনি সেই সমালোচনা শুনেছেন এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংশোধনও করেছেন। শুধু সরকারের সমালোচনা করার কারণে কাউকে রাষ্ট্রের শত্রু ঘোষণা করা হয়নি বলেও মন্তব্য করেন।
সাক্ষাৎকারের শেষ অংশে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, দুই দেশের মধ্যে স্থিতিশীল, বন্ধুত্বপূর্ণ ও পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক কেবল দুই দেশের জনগণের জন্য নয়, সমগ্র অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে যে আস্থার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, সেটিই ভবিষ্যতের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।
সাক্ষাৎকারের সমাপ্তিতে শেখ হাসিনা বলেন, “প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে ঠিক এমন সম্পর্কই থাকা উচিত। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।”