কলম থামাতে হামলা? দুর্নীতির অনুসন্ধানে গিয়ে রক্তাক্ত সাংবাদিক

মানিকগঞ্জে এক সরকারি সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন দুই সাংবাদিক। অভিযোগ রয়েছে, তাদের মারধর করে ক্যামেরা, ট্যাব ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়, মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রারসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

PostImage

কলম থামাতে হামলা? দুর্নীতির অনুসন্ধানে গিয়ে রক্তাক্ত সাংবাদিক


মানিকগঞ্জে এক সরকারি সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হয়েছেন দুই সাংবাদিক। হামলায় তাদের মারধর করে গুরুতর আহত করার পাশাপাশি সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জাম, নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া, মোটরসাইকেল ভাঙচুর এবং প্রকাশ্যে প্রাণনাশ ও লাশ গুমের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘বাংলা অ্যাফেয়ার্স’-এর সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম (রাজু হামিদ) বাদী হয়ে মানিকগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে বর্তমান ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার মো. নাজমুল হাসান (৫০), তার সহযোগী মো. আল মামুন (৩৮) এবং অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

আহত অপর সাংবাদিক হলেন শেখ মোখলেছুর রহমান (শহীদ), যিনি একই প্রতিষ্ঠানে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত।

পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে হামলার অভিযোগ

অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ২৫ জুলাই ২০২৬ শনিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সাংবাদিক রাজু হামিদ ও শেখ মোখলেছুর রহমান মানিকগঞ্জের গঙ্গাধরপট্টি এলাকায় গিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার নাজমুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে কিছু তথ্য জানতে চাইলে তিনি তথ্য দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাদের অপেক্ষা করতে বলেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করানোর পর দুপুর দেড়টার দিকে নাজমুল হাসানের সহযোগী আল মামুন দুই সাংবাদিককে কৌশলে বেউথা রোডের ‘বার্গারগঞ্জ’ নামে একটি রেস্টুরেন্টে নিয়ে যান। সেখানে অপেক্ষার পর সাংবাদিকরা রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা অভিযুক্তরা অতর্কিত হামলা চালায়।

মারধর, ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়া ও নগদ টাকা লুট

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, হামলাকারীরা দুই সাংবাদিককে কিল-ঘুষি মেরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। একপর্যায়ে তাদের কাছ থেকে প্রায় দুই লাখ টাকা মূল্যের ক্যানন ৭১০০ মডেলের ক্যামেরা, বয়া মাইক্রোফোন ও একটি ট্রাইপড/সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পাশাপাশি সম্পাদক রাজু হামিদের পকেটে থাকা ৮ হাজার টাকা জোরপূর্বক নিয়ে নেওয়া হয়।

এ সময় সাংবাদিকদের ব্যবহৃত টিভিএস মোটরসাইকেলও ভাঙচুর করা হয়, যার ফলে অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাণনাশ ও লাশ গুমের হুমকি

হামলার সময় দুই সাংবাদিকের চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল থেকে সরে যাওয়ার আগে প্রাণে হত্যা ও লাশ গুম করে ফেলার প্রকাশ্য হুমকি দেয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তীতে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে আলোচনা শেষে রাজু হামিদ মানিকগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

পুলিশের বক্তব্য

মানিকগঞ্জ থানা জানিয়েছে, অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রার মো. নাজমুল হাসানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

ডিইউজের তীব্র নিন্দা

ঘটনার পর ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) এক বিবৃতিতে এ হামলার তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সংগঠনের সভাপতি সাজ্জাদ আলম খান তপু ও সাধারণ সম্পাদক আকতার হোসেন বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া, মোটরসাইকেল ভাঙচুর এবং প্রাণনাশের হুমকি স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য ভয়াবহ হুমকি। তারা দ্রুত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

ডিইউজে সতর্ক করে বলেছে, ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হলে সাংবাদিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

ডিআরইউর উদ্বেগ

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)-ও পৃথক বিবৃতিতে ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে।

ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, দুর্নীতির তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর এ ধরনের হামলা স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর সরাসরি আঘাত। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

বিএসআরএফের দাবি



বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ)-এর সভাপতি মাসউদুল হক ও সাধারণ সম্পাদক উবায়দুল্লাহ বাদল যৌথ বিবৃতিতে বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া এবং প্রাণনাশের হুমকি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তারা অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সতর্ক করেন, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে সাংবাদিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর আঘাত

সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মতে, দুর্নীতির অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর এ ধরনের সংঘবদ্ধ হামলা শুধু ব্যক্তি সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য নয়, স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্যও বড় ধরনের হুমকি। তারা মনে করেন, এ ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা না হলে ভবিষ্যতে সংবাদকর্মীদের নিরাপদে পেশাগত দায়িত্ব পালন আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর