ব্রাজিলে ফুটবলই যেন মহাবিশ্বের কেন্দ্র, যুক্তরাষ্ট্রে নয়-- ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার রদ্রিগো
বিশ্বকাপের পরিবেশ পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক ও রোমাঞ্চকর অনুভূতিগুলোর একটি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এই উন্মাদনা মূলত স্টেডিয়াম, আশপাশের রাস্তা এবং ফ্যান ফেস্টিভ্যালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ উত্তর আমেরিকার সংস্কৃতিতে ফুটবলের অবস্থান এখনও সীমিত
ব্রাজিলে ফুটবলই যেন মহাবিশ্বের কেন্দ্র, যুক্তরাষ্ট্রে নয়-- ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার রদ্রিগো
বিশ্বকাপের পরিবেশ পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক ও রোমাঞ্চকর অনুভূতিগুলোর একটি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এই উন্মাদনা মূলত স্টেডিয়াম, আশপাশের রাস্তা এবং ফ্যান ফেস্টিভ্যালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ উত্তর আমেরিকার সংস্কৃতিতে ফুটবলের অবস্থান এখনও সীমিত।
এটি ব্রাজিলের সঙ্গে বড় একটি পার্থক্য তৈরি করে। আমি সম্প্রতি উত্তর আমেরিকায় ব্রাজিল জাতীয় দলকে অনুসরণ করার পর দেশে ফিরেছি। ব্রাজিলে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়—এটি আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই বিশ্বকাপ চলাকালে জাতীয় দলই হয়ে ওঠে আমাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।
যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা নয়। সেখানে দীর্ঘ ইতিহাসসম্পন্ন এনএফএল, বেসবল ও বাস্কেটবলের মতো খেলার সঙ্গে ফুটবলকে প্রতিযোগিতা করতে হয়। এছাড়া অলিম্পিকও বড় আকর্ষণ। সেখানে থেকে আমার উপলব্ধি হয়েছে—বিশ্বকাপ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় জাতীয় ঘটনা নয়।
অন্যদিকে ব্রাজিলে পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্বকাপে জাতীয় দল খেললে গোটা দেশ এক আবেগে ভেসে যায়। কঠোর পরিশ্রমী এবং নানা কষ্টে থাকা মানুষদের জন্য এটি বিশ্বকে দেখানোর সুযোগ—"দেখো, আমরা কী করতে পারি।" এটি আমাদের গর্বের বিষয়।
আমরা শুধু পাঁচটি বিশ্বকাপ জয়ের জন্য জার্সির বুকে থাকা পাঁচটি তারকা নিয়ে গর্ব করি না; আমরা গর্ব করি ফুটবলের সঙ্গে আমাদের গভীর সম্পর্ক এবং সুন্দর ফুটবল খেলার আনন্দ নিয়েও। ভালো ফুটবল দেখলে আমাদের চোখ আনন্দে ঝলমল করে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালে টেলিভিশন চালিয়ে অনেক সময় কোনো ফুটবল ম্যাচই খুঁজে পেতাম না। কিন্তু ব্রাজিলে এমনটা হয় না। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের ফুটবল ম্যাচ প্রায় সবসময়ই কোনো না কোনো চ্যানেলে সম্প্রচারিত হয়।
ব্রাজিলে ভলিবল, মোটরস্পোর্ট ও বাস্কেটবলেরও জনপ্রিয়তা রয়েছে। কিন্তু ফুটবলের সঙ্গে কোনো খেলারই তুলনা হয় না।
ব্রাজিলে আমরা নিজেদের "ফুটবলের দেশ" বলি। বিশ্বকাপে জাতীয় দলের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই যেন দেশের জীবনযাত্রা চলে। অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন হয়, কিছু সরকারি সেবার কাজও সমন্বয় করা হয়। দৈনন্দিন জীবন পুরোপুরি থেমে যায় না, তবে সবাই চেষ্টা করে যেন ব্রাজিলের ম্যাচের সময় কাজের চাপ না থাকে। পরে আবার সবাই বাকি কাজগুলো গুছিয়ে নেয়।
টুর্নামেন্ট যত এগোয়, উত্তেজনাও তত বাড়তে থাকে। গ্রুপ পর্বে মরক্কোর সঙ্গে ড্র এবং হাইতি ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের পর মানুষের উচ্ছ্বাস আরও বেড়ে যায়। এরপর জাপানের বিপক্ষে ম্যাচ এবং এখন শেষ ষোলোতে নরওয়ের মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় পুরো দেশ।
জাতীয় দলের ম্যাচের সময় বিশাল বড় পার্টি ও জমায়েত হয়। তবে এর মানে এই নয় যে আমরা শুধু ব্রাজিলের খেলাই দেখি। ভালো ফুটবল হলে কে খেলছে, সেটা আমাদের কাছে বড় বিষয় নয়। নেদারল্যান্ডস–জাপান, ইকুয়েডর–জার্মানি, উরুগুয়ে–স্পেন, পর্তুগাল–ক্রোয়েশিয়া, ফ্রান্স–সুইডেন এবং ইংল্যান্ড–ডিআর কঙ্গোর মতো অনেক ম্যাচই ব্রাজিলের দর্শকরা উপভোগ করেছেন।
ব্রাজিলিয়ানরা ফুটবল ভালোবাসে, আর যারা ফুটবল ভালোবাসে তাদেরও ভালোবাসে। এই আবেগ দেশের প্রতিটি অঞ্চলে একই রকম। রাজধানী হোক কিংবা কয়েকশ মানুষের ছোট্ট কোনো গ্রাম—সব জায়গায় ফুটবলই আমাদের সূর্য, আর জীবনের বাকি সবকিছু যেন তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।
ব্রাজিলে এমন কথোপকথন খুবই স্বাভাবিক—
"আজ রাতে কনসার্ট, সিনেমা বা কোনো অনুষ্ঠানে যাবে?"
"অবশ্যই যাব, তবে আগে আমার দল বা জাতীয় দলের ম্যাচটা শেষ হোক।"
ব্রাজিল যখন নরওয়ের বিপক্ষে খেলবে, তখন অসংখ্য পরিবার টেলিভিশন বা বড় পর্দার সামনে একসঙ্গে বসে ম্যাচ দেখবে। ছোট-বড় সবাই এই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেবে।
ম্যাচ শুরুর আগে থাকবে দীর্ঘ বিশ্লেষণ, ভবিষ্যদ্বাণী আর আলোচনা—যেন দেশের ২০ কোটিরও বেশি মানুষই ফুটবল বিশেষজ্ঞ।
তারপর ৯০ মিনিটের খেলা। অনেকেই আবার চান ম্যাচ অতিরিক্ত সময় বা টাইব্রেকারে গড়াক, যাতে উত্তেজনা আরও কিছুক্ষণ স্থায়ী হয়।
ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় আলোচনা, তর্ক আর হাসি-ঠাট্টা। এর শুরু নির্দিষ্ট—শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। আর যদি ম্যাচটি শনিবার বা ছুটির আগের দিন হয়, তাহলে সেই আনন্দ আর উদ্যাপন আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
লেখক : রদ্রিগো, ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান