ঘন ঘন শিক্ষানীতি পরিবর্তন: দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সুফল নাকি বড় বিপর্যয়?
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে শিক্ষাক্রম ও শিক্ষানীতিতে বহুবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে গত দেড় দশকে সৃজনশীল পদ্ধতি, জেএসসি-পিইসি পরীক্ষা চালু ও বাতিল, এবং ২০২৩ সালে প্রবর্তিত অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক 'নতুন শিক্ষাক্রম' নিয়ে নানামুখী পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের শেষ দিকে এসে সেই নতুন শিক্ষাক্রম স্থগিত করে পুনরায় ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়া হয়েছে এবং ২০২৭-২০২৮ সাল নাগাদ আরেকটি পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম আনার পরিকল্পনা চলছে
ঘন ঘন শিক্ষানীতি পরিবর্তন: দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সুফল নাকি বড় বিপর্যয়?
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে শিক্ষাক্রম ও শিক্ষানীতিতে বহুবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে গত দেড় দশকে সৃজনশীল পদ্ধতি, জেএসসি-পিইসি পরীক্ষা চালু ও বাতিল, এবং ২০২৩ সালে প্রবর্তিত অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক 'নতুন শিক্ষাক্রম' নিয়ে নানামুখী পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের শেষ দিকে এসে সেই নতুন শিক্ষাক্রম স্থগিত করে পুনরায় ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়া হয়েছে এবং ২০২৭-২০২৮ সাল নাগাদ আরেকটি পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম আনার পরিকল্পনা চলছে।
দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া শিক্ষানীতিতে এই বারংবার এবং দ্রুত পরিবর্তন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর অত্যন্ত গভীর ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রধান প্রভাবগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে চরম বিভ্রান্তি ও মানসিক চাপ
একটি শিক্ষাক্রমের সাথে মানিয়ে নিতে শিক্ষার্থীদের কয়েক বছর সময় লাগে। কিন্তু ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে না তারা ঠিক কোন পদ্ধতিতে মূল্যায়ন হবে।
- পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতি: মূল্যায়ন পদ্ধতি (যেমন—পরীক্ষা থাকবে কি থাকবে না, প্রজেক্টভিত্তিক নাকি লিখিত পরীক্ষা) বারবার বদলানোর ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার ধারাবাহিকতা হারিয়ে ফেলে।
- ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা: হুটহাট সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যারিয়ার ও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভোগে।
২. শিক্ষকদের প্রস্তুতির অভাব ও পাঠদানে জটিলতা
যেকোনো নতুন শিক্ষানীতি সফল করার মূল কারিগর হলেন শিক্ষকরা। কিন্তু বাংলাদেশে নীতি পরিবর্তনের গতি এত তীব্র যে শিক্ষকরা নতুন পদ্ধতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার আগেই তা আবার বদলে যায়।
- প্রশিক্ষণের অপচয়: একটি নির্দিষ্ট কারিকুলামের জন্য শিক্ষকদের যে বিপুল অর্থ ও সময় খরচ করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, নীতি পরিবর্তনের সাথে সাথে সেই পুরো উদ্যোগ ও রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় হয়ে যায়।
- শ্রেণিকক্ষে সমন্বয়হীনতা: অনেক শিক্ষক নতুন গাইডলাইন পুরোপুরি আত্মস্থ করতে না পারায় শ্রেণিকক্ষে পুরোনো ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতেই পড়াতে বাধ্য হন, যার ফলে নতুন নীতির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
৩. গাইড বই ও কোচিং ব্যবসার প্রসার
শিক্ষানীতি পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য থাকে কোচিং নির্ভরতা এবং মুখস্থ বিদ্যা কমানো। কিন্তু বাস্তবে ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলে উল্টো চিত্র দেখা যায়।
- নির্ভরতা বৃদ্ধি: নতুন পদ্ধতি স্কুল বা পাঠ্যবই থেকে সহজে বুঝতে না পেরে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে বাজারচলতি নতুন গাইড বই এবং কোচিং সেন্টারের শরণাপন্ন হন। ফলে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ আরও বৃদ্ধি পায়।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সক্ষমতার ঘাটতি
উন্নত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অনুকরণে প্রায়ই আধুনিক নীতি সাজানো হয়, কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোর বাস্তব অবকাঠামোর কথা বিবেচনা করা হয় না।
- শহর ও গ্রামের বৈষম্য: ডিজিটাল কনটেন্ট বা প্রজেক্ট-ভিত্তিক শিক্ষা শহরের নামী স্কুলগুলোতে সফল হলেও, ল্যাব বা পর্যাপ্ত শিক্ষকবিহীন গ্রামীণ স্কুলগুলোতে তা বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। ফলে বারবার নীতি পরিবর্তন এই বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
৫. দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় মেধার ক্ষতি (Learning Loss)
ঘন ঘন এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হয় জাতীয় মেধাকে।
- মৌলিক দক্ষতার অভাব: বারবার কারিকুলাম ও বইয়ের বিষয়বস্তু ওলটপালট হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভাষা, গণিত এবং বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়গুলোর ভিত্তি দুর্বল থেকে যাচ্ছে।
- আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পিছিয়ে পড়া: সুনির্দিষ্ট ও স্থিতিশীল শিক্ষানীতি না থাকায় আমাদের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো যোগ্যতা অর্জনে হিমশিম খাচ্ছে।
উত্তরণের উপায় কী?
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষা কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বা ক্ষণস্থায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয় হওয়া উচিত নয়। রাজনৈতিক দল বা সরকারের পরিবর্তনের সাথে সাথে যেন শিক্ষানীতি বদলে না যায়, সেজন্য একটি জাতীয় স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, পর্যাপ্ত পাইলটিং (পরীক্ষামূলক চালনা) এবং শিক্ষকদের শতভাগ প্রস্তুত করার পরই কেবল শিক্ষাক্রমে যেকোনো যুগোপযোগী পরিবর্তন আনা উচিত।