নিউইয়র্কে হামের প্রকোপ ভয়াবহ, জরুরি অবস্থা জারি করে টিকা কার্যক্রম বাড়াল সরকার
নিউইয়র্কে হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়ায় জরুরি অবস্থা জারি, গ্রামীণ এলাকায় টিকাদান ও রোগ শনাক্তকরণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।
নিউইয়র্কে হামের প্রকোপ ভয়াবহ, জরুরি অবস্থা জারি করে টিকা কার্যক্রম বাড়াল সরকার
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকায় রাজ্যজুড়ে দুর্যোগজনিত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। গভর্নর ক্যাথি হোকুল ৫ অক্টোবর নির্বাহী আদেশ জারি করে এই সিদ্ধান্ত নেন। রাজ্য স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৩ অক্টোবর পর্যন্ত নিউইয়র্কে চলতি বছরে মোট ১০৮টি নিশ্চিত হামের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৯২টি ঘটনা ১৫ জুলাইয়ের পর থেকে রাজ্যের ১৮টি কম টিকাপ্রাপ্ত গ্রামীণ এলাকায় শনাক্ত হয়েছে।
নতুন জরুরি ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হলো দ্রুত টিকাদান বাড়ানো, সন্দেহজনক রোগীর পরীক্ষা সহজ করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষদের দ্রুত শনাক্ত করা। এর অংশ হিসেবে টিকা দেওয়ার অনুমোদিত স্বাস্থ্যকর্মীর পরিধি বাড়ানো হয়েছে। এখন প্যারামেডিক, উন্নত জরুরি চিকিৎসাকর্মী, ধাত্রী এবং ওষুধ বিক্রেতাদের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হাম, মাম্পস ও রুবেলার টিকা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিবন্ধিত নার্সদের হামের পরীক্ষা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে।
রাজ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগগুলো ইতোমধ্যে এক হাজারের বেশি টিকার ডোজ বিতরণ করেছে। বিশেষ করে যেসব গ্রামীণ এলাকায় টিকাদানের হার তুলনামূলকভাবে কম, সেখানে টিকাদান কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, দ্রুত টিকাদান এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা মানুষদের শনাক্ত করাই সংক্রমণের বিস্তার কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
নিউইয়র্ক শহরেও হামের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, তবে চলতি সংক্রমণের বড় অংশ শহরের বাইরে। নিউইয়র্ক শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২ অক্টোবর পর্যন্ত শহরে সাতটি নিশ্চিত হামের ঘটনা ছিল। রাজ্যের বাইরে থাকা গ্রামীণ এলাকাগুলোতেই বর্তমানে বেশি সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং টিকাবিহীন ব্যক্তিরা সহজেই সংক্রমিত হতে পারেন। সাধারণত জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দিয়ে রোগটি শুরু হয়। কয়েক দিন পর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং মৃত্যুও ঘটতে পারে।
নিউইয়র্ক স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া। যাদের টিকাদানের অবস্থা নিশ্চিত নয়, তাদের চিকিৎসক বা স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের টিকার তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের টিকার অবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্যগুলোর সংক্রমণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিউইয়র্কের পাশের পেনসিলভানিয়ায় এক হাজারের বেশি হামের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। সেখানে প্রায় ২০০ মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং পাঁচটি মৃত্যুর খবর রাজ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। পেনসিলভানিয়ার এই সংক্রমণ তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে অঙ্গরাজ্যটির সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় নিউইয়র্কের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও নজরদারি বাড়িয়েছে। কারণ হাম খুব দ্রুত ছড়াতে পারে এবং কম টিকাপ্রাপ্ত কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি প্রবেশ করলে অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক মানুষ সংক্রমিত হতে পারেন। এ কারণে শুধু আক্রান্ত এলাকার মানুষ নয়, পুরো রাজ্যের বাসিন্দাদের টিকার অবস্থা যাচাই করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়েও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরে প্রায় তিন হাজার নয়শ হাম শনাক্ত হয়েছে বলে সাম্প্রতিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংখ্যা কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বার্ষিক সংক্রমণের মাত্রার দিকে ইঙ্গিত করছে। পেনসিলভানিয়া ছাড়াও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে বড় আকারের সংক্রমণ চলছে।
নিউইয়র্কের জরুরি ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশটিতে শিশুদের টিকাদানের হার নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো জনগোষ্ঠীতে পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষ টিকা না নিলে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। তাই শুধু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়ার চেয়ে আগেই টিকাদানের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা অনেক বেশি কার্যকর।
রাজ্যের জরুরি আদেশের আওতায় স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি পরীক্ষার সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলে সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হলে দ্রুত পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা মানুষদের বিষয়ে অনুসন্ধান জোরদার করা হবে।
নিউইয়র্কের স্বাস্থ্য বিভাগ সেপ্টেম্বরেই হামের জন্য আলাদা তথ্যভান্ডার চালু করেছিল। এর মাধ্যমে অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন এলাকার সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে। তখনই স্বাস্থ্য বিভাগ গ্রামীণ অঞ্চলে সংক্রমণ বৃদ্ধির কথা জানিয়ে বাসিন্দাদের টিকার অবস্থা পরীক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছিল। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে রাজ্যের মোট নিশ্চিত সংক্রমণ ছিল ৫৭টি; পরবর্তী সময়ে তা বেড়ে ১০৮-এ পৌঁছেছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—নিউইয়র্কে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলেও রাজ্যজুড়ে ভয়াবহ মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে, এমন দাবি সঠিক নয়। সংক্রমণের বড় অংশ নির্দিষ্ট কিছু গ্রামীণ এলাকায় কেন্দ্রীভূত। একইভাবে নিউইয়র্ক শহরেই সবচেয়ে বেশি রোগী রয়েছে এমন দাবিও ভুল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শহরে সাতটি ঘটনা থাকলেও রাজ্যের অন্যান্য অংশে ১০১টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জরুরি অবস্থা ঘোষণার অর্থ এই নয় যে সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে টিকা দেওয়া হবে। বরং প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে টিকা দেওয়ার সুযোগ বাড়ানো, পরীক্ষা দ্রুত করা এবং সংক্রমণ শনাক্ত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সম্মতি ও স্বাস্থ্যবিধির নিয়ম বহাল রয়েছে।
ফেডারেল স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষও নিউইয়র্ককে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। স্বাস্থ্য ও মানবসেবা দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা রাজ্য সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে প্রস্তুত। রোগের বিস্তার পর্যবেক্ষণ এবং টিকাদান কার্যক্রমে এই সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তথ্য যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, নিউইয়র্কে হামের প্রকোপ এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণার খবরটি সত্য। ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ১০৮টি নিশ্চিত ঘটনা, ১৮টি গ্রামীণ কাউন্টিতে ৯২টি ঘটনা এবং এক হাজারের বেশি টিকা দেওয়ার তথ্য একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র ও নিউইয়র্ক স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যের সঙ্গে মিলে গেছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অতিরঞ্জিত রোগী সংখ্যা বা নিউইয়র্ক শহরকে কেন্দ্র করে বড় আকারের সংক্রমণের দাবি সরকারি তথ্য সমর্থন করে না।
বর্তমানে কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য হলো সংক্রমণের গতি কমানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত রাখা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সময়মতো টিকাদান, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষদের পর্যবেক্ষণ করা গেলে সংক্রমণের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। নিউইয়র্কের জরুরি ব্যবস্থা ৪ নভেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা রয়েছে।