চীন–জাপান উত্তেজনা: সর্বশেষ বিরোধের পেছনে কী?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে টোকিও ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক কখনও উষ্ণ, কখনও শীতল হলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তা নতুন করে তলানিতে পৌঁছেছে। চীন জাপানের বিরুদ্ধে "বেপরোয়া নতুন সামরিকতাবাদ" অনুসরণের অভিযোগ এনে সামরিক ও বেসামরিক—উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহারযোগ্য (ডুয়াল-ইউজ) পণ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪০টি জাপানি প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে
চীন–জাপান উত্তেজনা: সর্বশেষ বিরোধের পেছনে কী?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে টোকিও ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক কখনও উষ্ণ, কখনও শীতল হলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তা নতুন করে তলানিতে পৌঁছেছে। চীন জাপানের বিরুদ্ধে "বেপরোয়া নতুন সামরিকতাবাদ" অনুসরণের অভিযোগ এনে সামরিক ও বেসামরিক—উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহারযোগ্য (ডুয়াল-ইউজ) পণ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪০টি জাপানি প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।
অন্যদিকে জাপান অভিযোগ করেছে, চীন ও রাশিয়ার যৌথ বোমারু বিমান মহড়া তাদের আকাশসীমার কাছে পরিচালিত হয়েছে এবং চীনা কোস্টগার্ড জাপানের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে (EEZ) প্রবেশ করেছে। একই সময়ে টোকিও জানিয়েছে, তারা দেশের পূর্বাঞ্চলের একটি দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা মোতায়েন করবে।
সর্বশেষ উত্তেজনার সূচনা কীভাবে?
২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দায়িত্ব নেওয়ার তিন সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে বলেন, তাইওয়ানের ওপর হামলা যদি জাপানের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে।
যদিও এটি জাপানের সরকারি নীতির বাইরে ছিল না, অতীতে দেশটির নেতারা তাইওয়ান ইস্যুতে সম্ভাব্য সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য এড়িয়ে চলতেন।
চীন দ্রুত ও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। বেইজিং জাপানের বিরুদ্ধে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, কূটনৈতিক বৈঠক বাতিল করে এবং চীনা নাগরিকদের জাপান ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করে। পাশাপাশি চীন–জাপান ফ্লাইট কমানো হয়, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় স্থগিত হয় এবং জাপানি সামুদ্রিক খাদ্য আমদানির নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়।
চীন ও জাপানের বৈরিতার ইতিহাস
চীনের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের দখলদারিত্ব ও নৃশংসতার জন্য টোকিও কখনও যথেষ্ট আন্তরিকভাবে ক্ষমা চায়নি। তাই জাপানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকে বেইজিং অতীতের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা হিসেবে তুলে ধরে।
অন্যদিকে জাপানের বিভিন্ন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, বড় বড় কোম্পানি এবং সম্রাটরা বহুবার দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চেয়েছেন। তবে সমালোচকদের মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী অতীতের মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে জার্মানির মতো গভীর আত্মসমালোচনা জাপান করেনি।
এছাড়া জাপানি রাজনীতিকদের ইয়াসুকুনি মন্দির সফর—যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের "ক্লাস-এ" যুদ্ধাপরাধীদেরও স্মরণ করা হয়—চীনের অভিযোগকে আরও উসকে দেয়।
জাপান কি সত্যিই 'নতুন সামরিকতাবাদ' অনুসরণ করছে?
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তা জাপানকে প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
এ বছর জাপান তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট ৯.৪ শতাংশ বাড়িয়ে প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে এবং জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির দল দীর্ঘদিন ধরেই যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিবাদী সংবিধানের সংশোধনের পক্ষে। তাদের যুক্তি, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় শক্তিশালী চীন ও পারমাণবিক অস্ত্রধারী উত্তর কোরিয়ার মুখে পুরোনো সীমাবদ্ধতা আর কার্যকর নয়।
চীনের প্রতিরক্ষা ব্যয় জাপানের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি (প্রায় ২৭৫ বিলিয়ন ডলার) হলেও বেইজিং দাবি করে, বিশাল জনসংখ্যার কারণে মাথাপিছু ব্যয় তুলনামূলক কম। তবে অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, চীন প্রকৃত সামরিক ব্যয়ের একটি অংশ অন্যান্য খাতে দেখিয়ে প্রকৃত ব্যয় কম দেখায়।
বাণিজ্যে প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
রাজনৈতিক উত্তেজনা দুই দেশের বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলেছে। চীন বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থ) রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং এ-সংক্রান্ত অভিযোগে দুই জাপানি নাগরিককে আটক করেছে। ফেব্রুয়ারিতে জাপানে চীনা পর্যটকের সংখ্যা ৪৫ শতাংশ কমে যায়, আর চীনে জাপানি চলচ্চিত্রের মুক্তিও বাতিল হয়েছে।
তবুও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখনো দৃঢ়। ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৩২২ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে, এবং চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেও বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতাই দুই দেশকে বড় ধরনের সংঘাত থেকে বিরত রাখতে পারে।
বর্তমানে জাপান কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে নভেম্বরে শেনঝেনে অনুষ্ঠিতব্য এপেক (APEC) সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছে।
তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বারবার তাকাইচিকে তাইওয়ান-সংক্রান্ত মন্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু জাপানে ওই মন্তব্য ব্যাপক জনসমর্থন পাওয়ায় তা থেকে সরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করা হচ্ছে।