গ্যাস, ইঞ্জিন অয়েল ও যন্ত্রাংশের সংকটে স্থবির হয়ে পড়ছে গাজা

খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকটের মধ্যেই গাজার বাসিন্দারা এখন নতুন এক বিপদের মুখোমুখি—গ্যাস, ইঞ্জিন অয়েল এবং যন্ত্রাংশের ঘাটতি। এর প্রভাব পড়ছে রুটি উৎপাদন, পানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যবস্থা এবং জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমে, যা গাজার মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে

PostImage

গ্যাস, ইঞ্জিন অয়েল ও যন্ত্রাংশের সংকটে স্থবির হয়ে পড়ছে গাজা


খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকটের মধ্যেই গাজার বাসিন্দারা এখন নতুন এক বিপদের মুখোমুখি—গ্যাস, ইঞ্জিন অয়েল এবং যন্ত্রাংশের ঘাটতি। এর প্রভাব পড়ছে রুটি উৎপাদন, পানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যবস্থা এবং জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমে, যা গাজার মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে।

গত সপ্তাহান্তে মধ্য গাজার প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র আল-আকসা মার্টার্স হাসপাতাল সতর্ক করে জানায় যে তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী জেনারেটরগুলো বিকল হয়ে পড়ায় একটি বড় স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. রায়েদ হুসেইন বলেন, অপারেশন থিয়েটার সচল রাখতে ব্যবহৃত একটি সহায়ক জেনারেটর হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অস্ত্রোপচার কার্যক্রম সীমিত করতে হয়েছে।

তিনি জানান, গাজায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের অভাবে এখন কেবল অস্থায়ী ও ‘প্যাচওয়ার্ক’ ধরনের মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে। অনেক পুরোনো জেনারেটর খুলে তার যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে অন্য জেনারেটর সচল রাখা হচ্ছে, কিন্তু এটিও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

অন্যদিকে গাজার সিভিল ডিফেন্স বিভাগ সতর্ক করেছে যে অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। জ্বালানি, ইঞ্জিন অয়েল এবং যানবাহনের যন্ত্রাংশের অভাবে ইতোমধ্যে তিনটি ফায়ার সার্ভিস যান এবং দুটি অ্যাম্বুলেন্স অকেজো হয়ে পড়েছে।

এক লিটার ইঞ্জিন অয়েলের দাম যুদ্ধের আগে যেখানে ছিল প্রায় ২৫ শেকেল, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,২০০ শেকেল (প্রায় ৫৭০ পাউন্ড)। বাজারে যে অল্প পরিমাণ অয়েল পাওয়া যাচ্ছে, তার বেশিরভাগই পুরোনো ও নিম্নমানের।

দেইর আল-বালাহ এলাকার গাড়ি ও ইঞ্জিন মেরামতকারী রফিক হামুদা জানান, সম্পূর্ণ মেরামত করা সাতটি গাড়ি শুধুমাত্র ইঞ্জিন অয়েলের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় থাকা কিছু গাড়ি খুলে তাদের যন্ত্রাংশ অন্য গাড়িতে ব্যবহার করছেন। তার ভাষায়, “এটা যেন লাইফ সাপোর্টে থাকা রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা।”

পরিবহন সংকট সাধারণ মানুষের জীবনেও বড় প্রভাব ফেলছে। দেইর আল-বালাহে আশ্রয় নেওয়া পাঁচ সন্তানের মা হেবা কাহমান জানান, তার আহত স্বামীকে চিকিৎসার জন্য কয়েক কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে নিতে প্রায়ই তাকে হুইলচেয়ার ঠেলে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়, কারণ পর্যাপ্ত যানবাহন নেই।

জাতিসংঘের শিশু সংস্থা UNICEF-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যন্ত্রাংশ ও ইঞ্জিন অয়েলের সংকটে গাজার পানি ও স্যানিটেশন খাতও মারাত্মক চাপে রয়েছে। সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোর দৈনিক উৎপাদন মার্চ মাসের ২০ হাজার ঘনমিটার থেকে কমে ১৬ হাজার ঘনমিটারে নেমে এসেছে।

এদিকে বেকারিগুলোও সংকটে পড়েছে। গাজার বেকারি মালিক সমিতির প্রধান আবদেল নাসের আল-আজরামি বলেন, অনেক বেকারি জেনারেটর চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অয়েল না পাওয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বা বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বেকারি বন্ধ হলে মানুষের জন্য রুটি সংগ্রহ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর ইসরায়েলি বিধিনিষেধের কারণে অনেক পরিবার রান্নার জন্য কাঠের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু কাঠের দামও ব্যাপক বেড়েছে। ফলে অনেক পরিবার এখন প্লাস্টিক ও নাইলন পুড়িয়ে রান্না করতে বাধ্য হচ্ছে।

গাজার বাসিন্দাদের মতে, গ্যাস, পানি, পরিবহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর এই বহুমাত্রিক সংকট তাদের দৈনন্দিন জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে। অনেকেই এখন শুধুমাত্র সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজনগুলো পূরণের দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন, কারণ অধিকাংশ মৌলিক পণ্যই হয় অপ্রাপ্য, নয়তো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর