বাংলাদেশি-আমেরিকান নিহাদ রহমানের ইজকেটার কিনতে ২৩০ কোটি ডলারের চুক্তি উবারের
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন উদ্যোক্তা নিহাদ রহমানের নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান কিনে খাবার ব্যবসায় বড় সম্প্রসারণের পথে এগোচ্ছে উবার।
বাংলাদেশি-আমেরিকান নিহাদ রহমানের ইজকেটার কিনতে ২৩০ কোটি ডলারের চুক্তি উবারের
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন ব্যবসায়ী নিহাদ রহমানের নেতৃত্বাধীন খাবার সরবরাহ ও কর্মক্ষেত্রের খাবার ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইজকেটারকে ২৩০ কোটি মার্কিন ডলারে অধিগ্রহণ করতে যাচ্ছে উবার। প্রযুক্তি ও ব্যবসা খাতে এই চুক্তিকে উবারের খাবার সরবরাহ ব্যবসাকে আরও বড় পরিসরে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর উবার এবং ইজকেটার যৌথভাবে এই অধিগ্রহণ চুক্তির ঘোষণা দেয়। চুক্তিটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২৩০ কোটি মার্কিন ডলার এবং পুরো অর্থ নগদে পরিশোধ করার কথা রয়েছে।
ইজকেটার মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কর্মক্ষেত্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য খাবার এবং বড় পরিসরের খাবার আয়োজনের ব্যবস্থা করে। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এক লাখ ৪০ হাজারের বেশি খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁ থেকে খাবার অর্ডার করতে পারে। কর্মীদের খাবার, অফিসের সভা, বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং নিয়মিত কর্মক্ষেত্রের খাবার সরবরাহের মতো সেবায় প্রতিষ্ঠানটি বিশেষভাবে কাজ করে।
এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিহাদ রহমান। তিনি ২০২২ সালে ইজকেটারে প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। এর আগে তিনি জেপি মরগান চেজে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে কাজ করেছেন এবং জেনারেল ইলেকট্রিকেও নেতৃত্বস্থানীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি অন্তর্বর্তী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হন এবং একই বছরের মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ইজকেটারের সঙ্গে উবারের এই চুক্তির মাধ্যমে উবার শুধু সাধারণ খাবার সরবরাহের বাজারেই নয়, বরং বড় প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট গ্রাহকদের খাবার সরবরাহের বাজারেও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে। উবারের বিদ্যমান খাবার সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ইজকেটারের কর্মক্ষেত্রভিত্তিক খাবার ব্যবস্থাপনা দক্ষতা একত্র হলে বড় অর্ডার এবং নিয়মিত করপোরেট খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
উবার জানিয়েছে, ইজকেটারের সেবা উবারের খাবার সরবরাহ ও ব্যবসায়িক গ্রাহকভিত্তিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এর ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান সভা, অনুষ্ঠান কিংবা কর্মীদের জন্য বড় পরিমাণ খাবার অর্ডার করতে আরও সহজ সুবিধা পেতে পারে। একই সঙ্গে রেস্তোরাঁগুলোও বড় অর্ডার ও নতুন গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাবে। খাবার সরবরাহকারীদের জন্যও বড় আকারের অর্ডার থেকে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা জানিয়েছে উবার।
চুক্তির আর্থিক দিকটিও ইজকেটারের ব্যবসার শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। উবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অধিগ্রহণ ঘোষণার আগের ১২ মাসে ইজকেটারের মোট বুকিং ২৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি ছিল। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির বুকিং বছরে প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশের কাছাকাছি হারে বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালন পর্যায়ে লাভজনক অবস্থায় রয়েছে বলেও উবার জানিয়েছে।
ইজকেটারের অর্ডারের গড় মূল্যও সাধারণ খাবার সরবরাহের অর্ডারের তুলনায় অনেক বেশি। প্রতিষ্ঠানটির গড় অর্ডার মূল্য ৪০০ মার্কিন ডলারের বেশি। ফলে উবারের জন্য এই অধিগ্রহণের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে বড় অঙ্কের অর্ডার এবং ব্যবসায়িক গ্রাহকদের কাছ থেকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল চাহিদা তৈরি করা।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উবার বর্তমানে পরিবহন সেবার পাশাপাশি খাবার ও পণ্য সরবরাহের ব্যবসা সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে। ইজকেটার অধিগ্রহণ সেই কৌশলেরই আরেকটি অংশ। বিশেষ করে অফিস, প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য একসঙ্গে অনেক খাবার সরবরাহের বাজার সাধারণ ব্যক্তিগত খাবার অর্ডারের চেয়ে আলাদা। এখানে নির্দিষ্ট সময়, বড় পরিমাণ খাবার এবং নিয়মিত ব্যবসায়িক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ইজকেটারের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা উবারকে এই বাজারে দ্রুত প্রবেশ করতে সহায়তা করতে পারে।
নিহাদ রহমানের জন্যও এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন ব্যবসায়ীর নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় প্রযুক্তি ও পরিবহন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এত বড় অঙ্কের অধিগ্রহণ চুক্তিতে পৌঁছানো প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি খাতে সাফল্যের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে। তবে চুক্তির অর্থ পুরোপুরি নিহাদ রহমান ব্যক্তিগতভাবে পাবেন—এমন কোনো তথ্য প্রকাশ্যে নেই। ২৩০ কোটি ডলার হলো ইজকেটার প্রতিষ্ঠানটির অধিগ্রহণমূল্য; এটি নিহাদ রহমানের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটিকে এখনই সম্পন্ন অধিগ্রহণ বলা ঠিক হবে না। উবার ও ইজকেটারের মধ্যে চুক্তি হয়েছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিক শর্ত পূরণ হওয়ার পরই লেনদেন চূড়ান্ত হবে। দুই প্রতিষ্ঠানই জানিয়েছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। ততক্ষণ পর্যন্ত উভয় প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘নিহাদ রহমানের প্রতিষ্ঠানকে উবার ২৩০ কোটি ডলারে কিনে ফেলেছে’ এমন বক্তব্য আংশিকভাবে সংশোধন করে বলা বেশি নির্ভুল। সঠিক তথ্য হলো, নিহাদ রহমানের নেতৃত্বাধীন ইজকেটারকে ২৩০ কোটি ডলারে কিনতে উবার চুক্তি করেছে; অধিগ্রহণ এখনো চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হয়নি। এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে কর্মক্ষেত্রের খাবার সরবরাহ, বড় অর্ডার এবং ব্যবসায়িক খাদ্যসেবা বাজারে উবারের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।