আদালত থেকে পালানোর মামলায় ফের পালাল আসামি, হাতকড়া খুলে পুলিশের চোখে ধুলো
যে মামলায় আদালত থেকে পালিয়েছিল, সেই মামলায় হাজির হয়ে আবারও পালাল আসামি শরিফুল; আদালতের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
আদালত থেকে পালানোর মামলায় ফের পালাল আসামি, হাতকড়া খুলে পুলিশের চোখে ধুলো
ঢাকার আদালত থেকে পালানোর মামলার আসামি শরিফুল ইসলাম আবারও আদালত থেকে পালিয়েছেন। মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জামসেদ আলমের আদালত থেকে কৌশলে হাতকড়া খুলে পালিয়ে যান তিনি। এর আগে ২০২৫ সালের জুনেও একই ব্যক্তি আদালত প্রাঙ্গণ থেকে পালিয়েছিলেন। ফলে একই আসামির দ্বিতীয়বার আদালত থেকে পালানোর ঘটনায় রাজধানীর আদালতগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, শরিফুল ইসলামকে কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়েছিল তাঁর আগের পালানোর ঘটনায় করা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য। তিনি আগে আদালত থেকে পালানোর পর তাঁর বিরুদ্ধে রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয়েছিল। সেই মামলাতেই মঙ্গলবার তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জামসেদ আলমের আদালতে মামলাটির কার্যক্রম হওয়ার কথা ছিল। তবে সাক্ষী উপস্থিত না থাকায় নির্ধারিত সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি। এরপর আদালত থেকে তাঁকে হাজতখানায় ফিরিয়ে নেওয়ার সময় ঘটে নতুন ঘটনা।
ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের কনস্টেবল আব্দুল আলিম শরিফুলকে আদালত থেকে হাজতখানার দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় শরিফুল কৌশলে হাতকড়া খুলে ফেলেন এবং আদালত প্রাঙ্গণ থেকে পালিয়ে যান। ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার মহিউদ্দিন মাহমুদ সোহেল ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, পালিয়ে যাওয়ার পর শরিফুলকে গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়েছে। আদালত প্রাঙ্গণের বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কীভাবে একজন উচ্চঝুঁকির আসামি আবারও হাতকড়া খুলে পুলিশের হেফাজত থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হলেন, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
শরিফুলের বিরুদ্ধে এর আগেও একটি গুরুতর হত্যা মামলা রয়েছে। তিনি খিলগাঁও থানায় দায়ের করা ২০১৮ সালের একটি কিশোর হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি। মামলাটি ১৪ বছর বয়সী জিসান হোসেনের অপহরণ ও হত্যার অভিযোগকে কেন্দ্র করে করা হয়েছিল।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে জিসানকে ঢাকার খিলগাঁও এলাকার সিপাহীবাগ থেকে অপহরণ করা হয়। পরে তাঁর মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে শনাক্ত করা হয়। এরপর হত্যা মামলা করা হয় এবং তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দেয়।
২০২১ সালে ওই মামলায় আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। পরবর্তী সময়ে মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে যায়। শরিফুল দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। কিন্তু ২০২৫ সালের ১৯ জুন আদালতে হাজির করার পর তিনি প্রথমবার পালিয়ে যান।
প্রথমবার পালানোর ঘটনাটিও ছিল নাটকীয়। পুলিশ ও আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আদালতের কার্যক্রম শেষে তাঁকে হাজতখানায় নেওয়ার সময় তিনি হাতকড়ার একটি অংশ ধাতব বস্তু দিয়ে ঢিলা করেন। এরপর দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যকে আঘাত করে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে পালিয়ে যান। ওই ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে নতুন মামলা করা হয়।
পরবর্তীতে পুলিশ তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করে। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হলো, প্রথমবার পালানোর ঘটনায় করা মামলার শুনানিতে হাজির হওয়ার পর সেই মামলারই আসামি আবার আদালত থেকে পালিয়ে গেলেন।
এ ঘটনায় আদালতের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একজন আসামি একবার আদালত থেকে পালানোর পর তাঁকে দ্বিতীয়বার আদালতে আনার সময় অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, সেটি এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে একজন আসামি কীভাবে পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় আবার হাতকড়া খুলে ফেলতে পারলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁকে আদালতে আনা, আদালতের ভেতরে রাখা এবং হাজতখানায় ফিরিয়ে নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় কোথায় নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল, তা খুঁজে বের করার দাবি উঠতে পারে।
ঢাকার আদালতগুলোতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক আসামি, আইনজীবী, পুলিশ, বিচারপ্রার্থী ও সাংবাদিকের উপস্থিতি থাকে। ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামান্য দুর্বলতাও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শরিফুলের দ্বিতীয়বার পালানোর ঘটনা সেই ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। কারণ এটি কোনো সাধারণ আসামির প্রথমবার পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়। তিনি আগে একই ধরনের ঘটনায় পালিয়ে আবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এরপরও তাঁকে আদালতে হাজির করার সময় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশ এখন তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ঘটনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আদালত থেকে কোনো হত্যা মামলার আসামি পালিয়ে গেলে শুধু একটি মামলার বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয় না, জননিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
এর আগে আদালত থেকে আসামি পালানোর একাধিক ঘটনা নিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শরিফুলের দ্বিতীয়বার পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দিল, শুধু নতুন নির্দেশনা দিলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। বাস্তবে আসামি পরিবহন, হাতকড়া ব্যবহার, পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব বণ্টন এবং আদালত প্রাঙ্গণের নজরদারি আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।