যুক্তরাষ্ট্রে স্যাটেলাইটে সরাসরি মোবাইল সংযোগ বাড়াতে নতুন বেতার তরঙ্গ নিলামের বড় উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সরাসরি মোবাইল সংযোগ বাড়াতে নতুন বেতার তরঙ্গ নিলামের পরিকল্পনা, বদলে যেতে পারে দুর্গম এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা।
যুক্তরাষ্ট্রে স্যাটেলাইটে সরাসরি মোবাইল সংযোগ বাড়াতে নতুন বেতার তরঙ্গ নিলামের বড় উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রে মোবাইল ফোনের সঙ্গে স্যাটেলাইটের সরাসরি সংযোগ বাড়াতে বড় ধরনের নতুন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে দেশটির ফেডারেল যোগাযোগ কমিশন। প্রচলিত মোবাইল টাওয়ারের বাইরে থাকা দুর্গম অঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা, সমুদ্রপথ কিংবা দুর্যোগকবলিত এলাকায় ফোনের যোগাযোগব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কমিশন জানিয়েছে, আগামী ২৯ অক্টোবর এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোট হতে পারে। প্রস্তাবটি অনুমোদনের পথে এগোলে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সরাসরি সাধারণ মোবাইল ফোনে যোগাযোগ দেওয়ার প্রযুক্তির জন্য নতুন বেতার তরঙ্গ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্যাটেলাইটনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত এগোচ্ছে। এর সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো এমন প্রযুক্তি, যেখানে ব্যবহারকারীর আলাদা স্যাটেলাইট থালা, বিশেষ যন্ত্র বা প্রচলিত মোবাইল টাওয়ারের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করার প্রয়োজন থাকে না। উপযুক্ত প্রযুক্তি ও অনুমোদিত তরঙ্গ ব্যবহার করে সরাসরি আকাশে থাকা স্যাটেলাইটের সঙ্গে সাধারণ মোবাইল ফোনের যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে যেসব জায়গায় মোবাইল টাওয়ার বসানো ব্যয়বহুল বা বাস্তবে কঠিন, সেসব এলাকাতেও যোগাযোগ পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ফেডারেল যোগাযোগ কমিশনের প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ২৫ মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গ নিলামের পরিকল্পনা। একই সঙ্গে মহাকাশ থেকে পরিপূরক যোগাযোগসেবার জন্য আরও ৪৮২ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ব্যবহারের সুযোগ তৈরির প্রস্তাবও বিবেচনা করা হবে। তবে এগুলো এখনো চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়নি। ২৯ অক্টোবর কমিশনের ভোটের পর নিয়ম প্রণয়ন, মতামত গ্রহণ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ধাপের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তাই এখনই যুক্তরাষ্ট্রের সব মোবাইল ফোন স্যাটেলাইটে সরাসরি যুক্ত হয়ে যাবে এমন দাবি সঠিক নয়।
এই প্রযুক্তি নিয়ে সবচেয়ে সক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি স্পেসএক্স। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থা গত ৬ অক্টোবর স্পেসএক্সের নতুন প্রজন্মের প্রায় ১৫ হাজার স্যাটেলাইট নিয়ে সরাসরি মোবাইল সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থাকে অনুমোদন করেছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে স্যাটেলাইট থেকে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা আরও এগিয়ে নিতে পারবে। এর আগে স্পেসএক্স ইকোস্টার থেকে ৬৫ মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গ প্রায় ১৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে কেনার চুক্তিও করেছিল।
ফেডারেল যোগাযোগ কমিশনের চেয়ারম্যান ব্রেন্ডন কারের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো মোবাইল নেটওয়ার্কের অন্ধকার অঞ্চল বা যোগাযোগবিহীন এলাকা কমানো। অর্থাৎ যেখানে প্রচলিত মোবাইল অবকাঠামো পৌঁছাতে পারে না, সেখানে মহাকাশভিত্তিক যোগাযোগকে অতিরিক্ত অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এই ব্যবস্থা বিশেষ করে জরুরি পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, বন্যা বা দাবানলে মোবাইল টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ বিকল্প পথ হিসেবে কাজ করার সুযোগ রাখে।
তবে এই প্রযুক্তি নিয়ে শুধু স্পেসএক্সই কাজ করছে না। অ্যামাজনের লিওসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি মোবাইল-স্যাটেলাইট যোগাযোগের বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ভবিষ্যতে প্রচলিত মোবাইল অপারেটর এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে। একই সময়ে এটিঅ্যান্ডটি, টি-মোবাইল ও ভেরাইজনও স্যাটেলাইটনির্ভর মোবাইল যোগাযোগ সম্প্রসারণের জন্য যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে।
এখানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে যোগাযোগের ধারণায়। এতদিন মোবাইল ফোনের কাভারেজ মূলত মাটিতে স্থাপিত টাওয়ার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করত। নতুন ব্যবস্থায় আকাশে থাকা স্যাটেলাইট সেই কাভারেজের একটি অংশ পূরণ করতে পারে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা, দূরবর্তী সড়কে চলাচলকারী মানুষ, সমুদ্রপথে থাকা নৌযান কিংবা দুর্যোগের সময় উদ্ধারকর্মীরা ভবিষ্যতে আরও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ সুবিধা পেতে পারেন।
তবে প্রযুক্তিটির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি মোবাইল ফোনে সংকেত পাঠাতে দূরত্ব, সংকেতের শক্তি, সময়ের বিলম্ব এবং স্যাটেলাইটের দ্রুত গতির মতো বিষয় মোকাবিলা করতে হয়। সাধারণ মোবাইল ফোন মূলত মাটির কাছাকাছি মোবাইল টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তৈরি হওয়ায় মহাকাশ থেকে সরাসরি সংকেত গ্রহণ ও পাঠানোর ক্ষেত্রে আলাদা প্রযুক্তিগত সমাধান প্রয়োজন। স্পেসএক্সের নিজস্ব নথিতেও এসব প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।